• তারাতলা বিপর্যয়ে সিট-নজরে প্ল্যান, অভিযোগ ফিরহাদের বিরুদ্ধেও
    এই সময় | ২৮ জুন ২০২৬
  • এই সময়: তারাতলা–বিপর্যয়ে আগেই গ্রেপ্তার হয়েছেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের তৎকালীন ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার এই ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের হলো ফিরহাদের বিরুদ্ধেও। তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলার আনোয়ার খান এবং ১৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলার শামস ইকবালের নামেও অভিযোগ দায়ের হয়েছে। শনিবার তারাতলা থানায় এ নিয়ে অভিযোগ দায়ের করে ভারতীয় জনতা মজদুর সেলের (বিজেএমসি) দক্ষিণ কলকাতা শাখা। ইতিমধ্যে তারাতলা–বিপর্যয়ের ঘটনায় কলকাতা পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। গড়া হয়েছে সিট। নতুন দায়ের হওয়া অভিযোগটিও সিট খতিয়ে দেখতে পারে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।

    একদিকে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করতে সিট যেমন তদন্ত করছে, তেমনই এতবড় বিপর্যয়ের পিছনে প্রযুক্তিগত সমস্যা কোথায় ছিল, তা খতিয়ে দেখতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এ দিন ঘটনাস্থলে যান। এই ব্যাপারে পাকাপোক্ত তথ্য পেতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হয়েছিল কলকাতা পুলিশ। এ দিন পাঁচজনের দল ঘটনাস্থলে যায়। ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক পার্থপ্রতিম বিশ্বাস। তা ছাড়াও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে দু’জন, আর্কিটেকচার বিভাগের একজন এবং মেটালার্জি বিভাগ থেকে একজন অধ্যাপক অকুস্থল পরিদর্শন করেন। তার পরে পার্থপ্রতিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘গুদামঘর নির্মাণে কী কী সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল, তার নকশা কেমন ছিল— সবই খতিয়ে দেখা হবে। উদ্ধারকাজ শেষ হলে আবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হবে। শুধু নকশা নয়, মাটির নমুনাও গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা হবে।’

    তারাতলা–বিপর্যয়ের পরে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নথি দেখিয়ে জানিয়েছিলেন, বিল্ডিং প্ল্যানে সই রয়েছে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের। তাঁর তৎকালীন ওএসডি কালীচরণের কথাও বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কালীচরণকে প্রাথমিক জেরার পরে শুক্রবার আদালতে পুলিশ দাবি করেছে, বি২ ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের ওই গোডাউনের নকশা নিয়ম ভেঙে পুরসভার অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন কালীচরণই। এ বার সেই সূত্রে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদকেও পুলিশ ডেকে পাঠাতে পারে বলে সূত্রের দাবি। বিজেএমসি–র নতুন অভিযোগের প্রেক্ষিতে শনিবার ফিরহাদ, আনোয়ার ও শামসের সঙ্গে ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ফিরহাদ আগেই বলেছেন, প্ল্যানের নথিতে সই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। নির্মাণের বিষয়ে তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না।

    সিট–এর তদন্তে এখনও পর্যন্ত ‘বেহরা ব্রাদার্স’–এর অন্যতম মালিক শম্ভুনাথ বেহরা–সহ মোট ৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। আইন না মেনে গোডাউনের স্ট্রাকচার তৈরির প্রজেক্ট শুরু হয়েছিল বলে অভিযুক্তদের বয়ানে ইঙ্গিত মিলেছে বলে সূত্রের খবর। তাঁদের বয়ানের প্রেক্ষিতে এ বার সংশ্লিষ্ট নথি জোগাড়ের উপরে জোর দিচ্ছেন গোয়েন্দারা। জানা গিয়েছে, ২০২৪–এর ১ অগস্ট ‘বেহরা ব্রাদার্স’কে ৩০ বছরের জন্য ওই জমি লিজ় দেওয়া হয় বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে। খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যে পরিমাণ জায়গায় কনস্ট্রাকশনের জন্য প্ল্যান অনুমোদিত হয়েছিল, সেই নিয়ম মানা হয়েছিল, নাকি তার তোয়াক্কা না করে আরও বেশি জায়গা জুড়ে অবৈধ নির্মাণ চলছিল?

    বিজেএমসি–র দাবি, তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট এফআইআর দায়ের করে অবৈধ নির্মাণ এবং বিপর্যয়ের জন্য যাঁরা অভিযুক্ত, তাঁদের গ্রেপ্তার করতে হবে। ফিরহাদ, আনোয়ার এবং শামস ইকবালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণগুলো দ্রুত পরিদর্শন করে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানির মতো ঘটনা যাতে না ঘটে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

    রাজ্যের পুর ও নগরন্নোয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও ইতিমধ্যে ফিরহাদের গ্রেপ্তারি দাবি করেছেন। শুক্রবার তিনি প্রশ্ন তোলেন ‘কালীচরণকে যদি গ্রেপ্তার করা হয়, তা হলে ফিরহাদ হাকিমকে কেন গ্রেপ্তার করা হবে না?’ বিজেএমসি–র দাবি, গোডাউনের বিপর্যয় নিছক দুর্ঘটনা নয়। বেআইনি নির্মাণের কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। সংগঠনের অভিযোগ, ‘কলকাতা পোর্ট এলাকায় যত নির্মাণ হয়েছে, সবই ফিরহাদ হাকিম, আনোয়ার খান আর শামস ইকবালের মদতে হচ্ছে। ওঁদের শাগরেদ ছিলেন আসগর (তারাতলায় মারা গিয়েছেন)। একটা বড় র‌্যাকেট চলত।’ কালীচরণকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নিতে আদালতেও পুলিশের তরফে জানানো হয়েছিল, কালীচরণ একা জড়িত নন। ‘টিম ওয়ার্ক’ করে অনুমোদনহীন প্ল্যান পাশ করানো হতো। তাঁর মাথায় কার হাত রয়েছে, কে তাঁর রক্ষাকর্তা, তা জানতে হবে বলেও আদালতে জান‍ান‍ সরকারি কৌঁসুলি সৌরীন ঘোষাল।

  • Link to this news (এই সময়)