সুজয় মুখোপাধ্যায়
হুগলি জেলার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের পরত। এই জেলার স্থাপত্য, ভাস্কর্য, শিল্প থেকে শুরু মিষ্টি— সবেতেই লুকিয়ে আছে ঐতিহ্য, তার সঙ্গেই রয়েছে নানা অজানা গল্প। সেই তালিকায় হয়তো একেবারে প্রথমে থাকবে চন্দননগরের বিখ্যাত ‘জলভরা সন্দেশ’। লোকমুখে প্রচলিত যে, প্রায় দু’শো বছর আগে নতুন জামাইকে বোকা বানানোর আবদার থেকেই জন্ম হয়েছিল এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির। সেই জলভরা সন্দেশ এ বার জিআই (GI) স্বীকৃতি পেয়েছে। এর স্বাদ গ্রহণ করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে খোদ ভ্যাটিকানের পোপও।
চন্দননগরের জলভরার স্রষ্টা সূর্য মোদক। ওই বংশের বর্তমান প্রজন্ম জানাচ্ছেন, ১৮১৮ সালে ভদ্রেশ্বরের তেলেনিপাড়ার জমিদার বাড়ি থেকে সূর্য মোদকের কাছে একটি অদ্ভুত আবেদন আসে। নতুন জামাইকে বোকা বানানোর বা মস্করা করার একটি সামাজিক রেওয়াজ ছিল সেই সময়ে। জমিদার বাড়ির মহিলারা জামাইকে ঠকাতে পারে, এমন একটি মিষ্টি তৈরির অনুরোধ করেন।
সূর্য মোদক অনেক চিন্তাভাবনা করেন, শেষ পর্যন্ত তালশাঁস দেখে তাঁর মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। তিনি ভাবেন, সন্দেশের আকৃতি যদি তালশাঁসের মতো করে তার ভিতরে রস পুরে দেওয়া যায়, তাহলে কেমন হবে? সেই ভাবনা থেকেই এল জলভরা সন্দেশ, পাঠানো হলো জমিদার বাড়িতে। নতুন জামাই নাকি সন্দেশে কামড় দিতেই রস পড়ে তাঁর গরদের পাঞ্জাবি ভিজে গিয়েছিল। তার পর থেকেই প্রবল জনপ্রিয় হয় সেই মিষ্টি। চন্দননগরের বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এই মিষ্টির সঙ্গে বাংলার প্রাচীন বিনোদন ও সামাজিক প্রথা জড়িয়ে রয়েছে।
সূর্য মোদকের বর্তমান উত্তরসূরি শৈবাল মোদক জানান, বিশুদ্ধ ছানা ও চিনি দিয়ে সন্দেশের পাক তৈরি হয়। এমন কৌশলে পাক দেওয়া হয়, যাতে সন্দেশের ভিতরে তরল রস দিলেও সেটা সন্দেশকে ভেঙে না দেয়। গরমকালে সাধারণত সন্দেশের ভিতরে চিনির রস ও সুগন্ধি গোলাপ জলের মিশ্রণ দেওয়া হয়। অন্য একটি মতে গরমকালে আমের রসও দেওয়া হতো সন্দেশের ভিতরে। শীতকালে জলভরার গায়ে থাকে গুড়ের গন্ধ, ভিতরে থাকে খাঁটি নলেন গুড়ের রস।
চন্দননগরের লক্ষীগঞ্জ বাজারের সূর্য মোদকের দোকানের জলভরা সন্দেশ দীর্ঘদিন ধরেই সমাদৃত। সম্প্রতি তারকেশ্বরে পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে সভা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর হাতে এই মিষ্টি তুলে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীও এই মিষ্টির স্বাদ নিয়েছেন। ব্যান্ডেল চার্চের ফাদারের মাধ্যমে রোমের ভ্যাটিকান সিটির পোপের কাছেও পৌঁছে গিয়েছিল চন্দননগরের এই গর্ব।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ পেয়েছে জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃতি। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করতে সুবিধা হবে বলে জানাচ্ছেন শৈবাল মোদক। কিন্তু বাধা রয়েছে। তিনি জানাচ্ছেন, বিশ্ববাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ— মিষ্টির শেল্ফ লাইফ বা মিষ্টির আয়ু। এখন গরমকালে এই মিষ্টি বড়জোর চার-পাঁচ দিন ভালো থাকে। রপ্তানি করতে গেলে এর স্থায়িত্ব অন্তত ছয় মাস হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন শৈবাল মোদক। তিনি জানিয়েছেন, মিষ্টির আয়ু বাড়ানোর জন্য গবেষণা প্রয়োজন। সেই কারণে তাঁরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দ্বারস্থ হয়েছেন। বিজ্ঞানের সাহায্যে এই লক্ষ্যপূরণ হলে বিশ্ববাজারে ম ম করবে জলভরার গন্ধ, আশায় কারিগরেরা।