• সর্পাঘাতের পর নবজীবন লাভ, চিকিৎসক ও নার্সদের কবিতা উপহার পাহাড়ের অষ্টাদশীর
    বর্তমান | ২৮ জুন ২০২৬
  • বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: ১২ জুন, শুক্রবার। দিনটা অন্যান্য আর পাঁচটা দিনের মতোই। সন্ধ্যাটাও আপাতভাবে তাই। অভ্যাস বশে পাহাড়ি পাকদণ্ডী ধরে ইভনিং ওয়াকে বেরিয়েছিলেন অর্চনা। সে হাঁটা যে জীবন ছিনিয়ে নিতে যাচ্ছিল, কে জানত! কিছুক্ষণ হাঁটার পর হঠাৎ বাঁ পায়ে যন্ত্রণা বোধ করেন দর্শন নিয়ে সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া এই অষ্টাদশী। তারপর কি হয়েছে সে কথাগুলি শুধু জানেন কালিম্পং বং বস্তির বাসিন্দারা, অর্চনার পরিবার, চিকিৎসকরা আর সিস্টাররা। অর্চনা নিজে জানতে পারার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তাঁর যন্ত্রণার কারণ, মারাত্মক বিষধর সাপের ছোবল। তার ফলে বেশ কিছুদিন সংঞ্জাহীন ছিলেন। ছিলেন সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন অবস্থায়। সরু একটি সুতোয় ঝুলছিল এই অষ্টাদশীর জীবন। তবে মৃত্যুকে হারিয়ে জয়ী হন প্রাণখোলা হাসি হাসা মেয়েটি। এই জীবন ফিরিয়ে দেওয়া লড়াইয়ের নেপথ্যে কালিম্পং জেলা হাসপাতালের হাইব্রিড সিসিইউ’য়ের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। 

    মাত্র কয়েকদিনের দেখাশোনা, চেনা ও জানা। তাতেই হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মীরা আপন করে নিয়েছিলেন মেয়েটিকে। তাই রোগমুক্তির পর নিজের জীবনদানের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণের কলমে লেখা একটি ইংরেজি কবিতা উপহার দিয়ে গিয়েছেন হাসপাতালের হাইব্রিড সিসিইউ’য়ের কর্মী-চিকিৎসকদের। সে উপহার পেয়ে অভিভূত কর্মী-চিকিৎসকরা। শনিবার তাঁরা বললেন, ‘অনেকে বলেন, ডাক্তার হলি কেন? এত প্রতিবন্ধকতা, চাপ, পরিবারকে সময় দেওয়া যায় না। কিন্তু যখন কোনো রোগী মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরে আসেন। জীবন ফিরে পান। তখন সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই আমরা। অর্চনার মতো রোগীদের লেখা কবিতা বা একটা ধন্যবাদ, কিংবা একটা ফুল—এগুলিই বলে দেয়, কেন আমরা ডাক্তারি করে আজও তৃপ্তি পাই।’ 

    কালিম্পং স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে খবর, ১২ তারিখ অর্চনা কৈরালাকে যখন কালিম্পং জেলা হাসপাতালে আনা হয় তখন একনাগাড়ে বমি করছিলেন। তীব্র শ্বাসকষ্ট। চোখে ঝাপসা দেখছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। জলদি তাঁকে হাইব্রিড সিসিইউতে ভর্তি করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে রাখা হয় ভেন্টিলেশনে। আসামাত্রই দেওয়া হয়েছিল ১০ ভাওয়েল এভিএস। চিকিৎসা চলাকালীন আরও ১০ ভাওয়েল দেওয়া হয়। প্রয়োগ করা হয় সর্পাঘাতের চিকিৎসার আদর্শ ওষুধ নিওস্টিগমিন ইত্যাদি। 

    ধীরে চিকিৎসায় সাড়া দিতে থাকেন অর্চনা। ১৬ জুন ভেন্টিলেশন থেকে তাঁকে বের করা আনা হয়। ন’দিন হাসপাতালে থাকার পর ২০ জুন ছুটি পান। কোন সাপ কামড়েছিল তাঁকে? চিকিৎসকরা জানান, কেউ সেকথা বলতে পারেননি। কিন্তু সাপের বিষের প্রকৃতি নিউরোটক্সিক। যা স্নায়ুতন্ত্রকে আচ্ছন্ন করে দেয়। এ বিষ মারাত্মক। অর্চনা বলেছেন, ‘আমার ধারনা কালাচ জাতীয় সাপ। ওদের বিষই তো নিউরোটক্সিক।’ তারপর কবিতার প্রসঙ্গ তুলতেই পাহাড়ের মেয়েটির মুখে লাজুক হাসি। বললেন, ‘ওঁরা নতুন জীবন দিয়েছেন। এ জীবনে সে কথা ভুলব না।’
  • Link to this news (বর্তমান)