• ‘টুথপিক’ পা নিয়েই ম্যাজিসিয়ান দেম্বেলে
    এই সময় | ২৮ জুন ২০২৬
  • সব্যসাচী সরকার, ডালাস

    ন’বছর আগে বছর কুড়ির রোগা-সোগা ছেলেটাকে যখন বার্সেলোনা নিয়েছিল, তখন বার্সা টিমে শেষ কথা বলতে মেসি। ১০৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে যখন তাঁকে নেওয়া হয়, ইউরোপের ফুটবলে দলবদলের ইতিহাসে সেটা ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ দর। পল পোগবা আর নেইমারের পরেই। তবু খুঁতখুঁতে বার্সা সমর্থকেরা ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছেলেটিকে সহজে আপন করে নিতে পারেননি। উড়ে আসত কটাক্ষ, ‘ওর পা দুটো টুথ পিকের মতো। রোগা চেহারা। এটা ফ্রান্স বা জার্মানির লিগ নয়। লা লিগায় ডিফেন্ডাররা ওকে কাঁদিয়ে ছাড়বে!’

    কে যে কাকে কাঁদিয়ে ছাড়ে! বার্সার থাকাকালীন বারবার ছেলেটির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের নানা অভিযোগ উঠেছে। কখনও জিমে সময় না দেওয়া, কখনও নিজের রুমে ভিডিয়ো গেমসে মেতে থাকা। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বজয়ী টিমে থাকলে কী হবে, অধিকাংশ সময়ে ছিলেন রিজ়ার্ভ বেঞ্চে। মেসি-নেইমারদের ছায়ায় বার্সায় ঢাকা পড়ে যাওয়া উসমান দেম্বেলে ২০২৩ সালে ফিরলেন জন্মভূমি ফ্রান্সে, তার পরেই অবিশ্বাস্য উত্থান। বার্সায় ‘টুথপিক’ আখ্যা পাওয়া কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটি এখন বিশ্বের ১০ জন বিরল ফুটবলারের একজন, যিনি বিশ্বকাপ ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন, সঙ্গে ব্যালন ডি’ওর। কাতারে সব ম্যাচ খেললেও সার্চলাইটে ছিলেন এমবাপে। এ বারও তো শুরুটা সে রকমই।

    কিন্তু নরওয়ে ম্যাচ দেখল প্রতিভার বিচ্ছুরণ, হিরের দ্যুতির মতো বস্টনের স্টেডিয়ামে ঠিকরে বেরোলেন ফরাসি উইঙ্গার। মাত্র ৩২ মিনিটে হ্যাটট্রিক, ম্যাচের শুরু থেকে ধরলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম। মেসির পাঁচ গোলের পরেই চার গোল করে তাঁর ক্যাপ্টেন এমবাপে, হাল্যান্ড, ভিনিসিয়াসের সঙ্গে একাসনে। দুনিয়া দেখল, ব্যালন ডি’ওর পুরস্কারটা মোটেই ভুল লোকের কাছে যায়নি। তিনটে গোলই বক্সের কোণ থেকে, গোটা তিন ডিফেন্ডারকে একেবারে ‘নির্বোধ’ বানিয়ে, গোলকিপারকে দাঁড় করিয়ে। বিস্ময়কর ফিনিশিং।

    শেষমেশ ৪-১ গোলে জয়, শেষ গোলটা দেসিরে দুয়ের। অভিভূত ক্যাপ্টেন এমবাপে সহ গোটা টিম। প্রথম দুটো গোলেই এমবাপের অ্যাসিস্ট, তৃতীয়টা মন মাতানো টিম মুভ। একটা সময়ে মনে হচ্ছিল, দেম্বেলের পায়ে চুম্বক লাগানো, চাইলেই যখন-তখন আসবে গোল। তৃতীয় গোলের পরে সেলিব্রেশনটা মানবিকতার গন্ধ মাখানো। যাকে বলা হচ্ছে, ‘আইস ইন মাই ভেইনস’ সেলিব্রেশন। প্যারিস সাঁ জামাঁয় খেলা টিমমেট জর্জিয়ার ভিচা কাভারাতস্কেলিয়ার জন্য, যিনি গোলের পরে এ ভাবে সেলিব্রেট করতে ভালোবাসেন। মানে, শট নেওয়ার চুড়ান্ত মুহূর্তে শিরায় রক্ত গরম হয়ে ভুলের প্রশ্ন নেই, ঠাণ্ডা থাকে মস্তিষ্ক। ভিচা বিশ্বকাপে নেই, তাই বন্ধুর প্রতি এই ভালোবাসা দেম্বেলের, যা পোস্ট করেছেন ভিচাও।

    আরও আশ্চর্যের, এই হ্যাটট্রিকের পরেও ম্যাচের পারফরম্যান্সকে সেরা বলছেন না ফরাসি তারকা। উল্টে বক্তব্য, ‘আমি খুশি, ইউনিক আর স্পেশ্যাল মোমেন্ট। কিন্তু সেনেগাল আর ইরাক ম্যাচে আমার আরও প্রভাব ছিল।’

    রাউন্ড অফ থার্টি টু-তে ফ্রান্স খেলবে সুইডেনের বিরুদ্ধে, নরওয়ের সামনে আইভরি কোস্ট। ফ্রান্স-নরওয়ে ম্যাচটাকে এমবাপে বনাম হাল্যান্ড ধরা হচ্ছিল। অথচ নরওয়ে কোচ স্টেল সোলবাক্কেন সব অঙ্ক বদলে দেন। প্রথম টিমে ১০টা বদল, হাল্যান্ড, ওডেগার্ডদের না নামিয়ে পুরো সেকেন্ড টিম নামিয়ে দেন। কারণ? অনেকেই মনে করছেন, তিনি রাউন্ড অফ থার্টি টু-তে আর এক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান টিম চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সুইডেনের মুখোমুখি হতে চাননি। চেয়েছিলেন আইভরি কোস্টকে। সে জন্যই ফ্রান্স ম্যাচটাকে গুরুত্বই দিলেন না। ডালাসেই ৩০ জুন হাল্যান্ডরা পাবেন আইভরি কোস্টকে। আবার সেনেগাল ৫–০ গোলে ইরাককে হারালেও রাউন্ড অফ থার্টি টু এখনও নিশ্চিত নয়।

    দ্য গার্ডিয়ানের ফুটবল লিখিয়ে বেন লিটনটন একবার লিখেছিলেন, ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুচেল তিন ভাগে ভাগ করেন ফুটবলারদের। এ, বি আর সি। ‘এ’ অর্থাৎ অ্যাগ্রেসিভ মোটিভেটেড, যাঁরা নিজের সাফল্য আর পুরস্কারকে সবচেয়ে আগে রাখেন। ‘বি’ হলো বাইন্ডিং মোটিভেটেড, যাঁরা অ্যাসিস্ট করতে, টিমগেম খেলতে নিঃস্বার্থ, স্বার্থপর নন। সবশেষে ‘সি’ অর্থাৎ কিউরিয়াস-মোটিভেটেড, যাঁদের মধ্যে আছে গ্রেট হয়ে ওঠার সব রসদ, যাঁদের একটু আলাদা ভাবে ট্রেন করতে হয় ম্যানেজারদের, ম্যাচে যে কোনও সময়ে এঁরা হয়ে ওঠেন উইনার।

    দেম্বেলেকে এই ‘সি’ গ্রুপে রাখছেন তুচেল, কারণ বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে খেলার সময়ে দেম্বেলেকে কোচিং করিয়েছিলেন তুচেল। ইংল্যান্ড কোচ যে খুব ভুল বলেননি, এই বিশ্বকাপ দেখছে।
  • Link to this news (এই সময়)