বিস্ময়ের নাম কেপ ভের্দে, ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে নক আউটে!
এই সময় | ২৮ জুন ২০২৬
সব্যসাচী সরকার, ডালাস
পৃথিবীর সব মায়েরাই তো এমন। হিউস্টনের স্টেডিয়ামে কেপ ভের্দে বনাম সৌদি আরবের ম্যাচ যত শেষ বাঁশির দিকে এগোচ্ছিল, ততই গ্যালারিতে পাগলের মতো দু’হাত তুলে নাচছিলেন আনা কান্দিদা এভোরা। বারবার ক্যামেরা ধরছিল তাঁকে। কেপ ভের্দের গোলকিপার ‘চাইনিজ় ওয়াল’ ভোজ়িনিয়ার মা।
নিজের দেশে সামান্য হাউস ক্লিনারের কাজ করা আনা এখন গ্লোবাল হেডলাইনে। পু্ত্র গর্বে আপ্লুত। কেপ ভের্দের প্রথম ম্যাচেই গোলপোস্টের নীচে অপ্রতিরোধ্য ভোজ়িনিয়া ইউরোপ সেরা স্পেনকে আটকে দিয়ে ক্লিনশিট (গোল হজম না করা) রেখে লুকোননি হতাশা। অকপটে এসেছিল স্বীকারোক্তি, ভিসার টাকা জোগাড় হয়নি বলে তাঁর মা আমেরিকায় খেলা দেখতে আসতে পারেননি। এই বক্তব্যের পরে ভিসা পেতে দেরি হয়নি, উদ্যোগী হয়েছিল ফিফা। কেপ ভের্দের বাকি দুটো ম্যাচই গ্যালারিতে বসে দেখলেন আনা।
হিউস্টনে চোখে পড়ছিল ব্যানার, ‘স্মল কান্ট্রি, বিগ ড্রিমস!’ ছোট দেশ, বড় স্বপ্ন তো বটেই। প্রথমবার বিশ্বকাপে নেমেই ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে নক আউটে। আফ্রিকার এই দেশটি আতলান্তিক মহাসাগরে কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টি। যার অবস্থান সেনেগাল উপকূল থেকে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে। জনসংখ্যা মাত্র ৫ লক্ষ ২৪ হাজার, সল্টলেক বা গড়িয়ার জনসংখ্যা এর চেয়ে বেশি হবে। তিনটে ম্যাচেই অপরাজিত। ইউরো জয়ী স্পেনের সামনে ০-০, র্যাঙ্কিংয়ে ১৬ নম্বরে থাকা উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ২-২, এশীয় শক্তি সৌদি আরবের সামনে শেষ ম্যাচে ০-০। কেপ ভের্দের বিশ্ব র্যাঙ্কিং? ৬৭! আগামী ৩ জুলাই মায়ামিতে রাউন্ড অফ থার্টি টু-তে তারা খেলবে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্তিনার সঙ্গে। থিয়েরি অঁরি থেকে ইব্রাহিমোভিচ, আলেক্সি লালাস থেকে হাবিয়ের এর্নান্দেস, আমেরিকার বিভিন্ন চ্যানেলে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা চোখ বুজে মেনে নিচ্ছেন, ৪৮ দেশের এই বিশ্বকাপে কেপ ভের্দেই সবচেয়ে বিস্ময়কর রূপকথা, যা বিশ্বের বহু দেশকে ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখাবে।
ম্যাচ শেষে টিমমেটদের সঙ্গে আনন্দাশ্রুতে ভাসছিলেন চল্লিশ পেরোনো গোলকিপার ‘বুড়ো ঘোড়া’ ভোজি়নিয়া। বিশ্বকাপের আগে ইনস্টাগ্রামে যাঁর ফলোয়ার ছিল ৫০ হাজার, সেটা এ ক’দিনে ১৭ মিলিয়ন মানে ১ কোটি ৭০ লক্ষ ছাড়িয়েছে। জীবনে প্রথমবার বিশ্বকাপে নেমে রেকর্ড বুকে নাম। কেন? ইংল্যান্ডের পিটার শিল্টন বিশ্বকাপে নেমে তিনটে ক্লিনশিট রেখেছিলেন, দুই নম্বরে দুটো ক্লিনশিট রেখে আর এক কিংবদন্তি ইতালির দিনো জফ। তাঁর সঙ্গে একাসনে এখন ভোজ়িনিয়া! ম্যাচ শেষে ভিড়ে ঠাসা প্রেস মিটে বলছিলেন, ‘কেপ ভের্দে একটা ছোট দেশ। বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আমরা ফুটবল খেলি। ছোট দেশ হতে পারি, কিন্তু সামনে যে দেশই আসুক, লড়াই করতে জানি। আমরা ফাইটার।’
টিমের কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো, যাঁকে পৃথিবী বুবিস্তা বলে জানে, তিনি সামনে প্রতিপক্ষ আজের্ন্তিনা জেনেও হাসছেন। ‘লিওনেল মেসি ও আর্জেন্তিনার সঙ্গে খেলাটা আমাদের দেশের কাছে বিশাল গর্বের মুহূর্ত। কিন্তু বিশ্বাস করি, নাথিং ইজ় ইম্পসিবল! আমরা লড়ব।’
রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে ফিফার নিয়ম অনুয়ায়ী একই সঙ্গে শুরু হয়েছিল দুটো ম্যাচ। মেক্সিকোর মাঠে স্পেন বনাম উরুগুয়ে, আমেরিকায় কেপ ভের্দে-সৌদি আরব। দুটো ম্যাচের একটায় কেপ ভের্দের স্বপ্নপূরণ, অন্যটায় দু’বারের বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ের স্বপ্নভঙ্গ। উরুগুয়ের কোচ আজের্ন্তিনীয় মার্সেলো বিয়েলসা, ধুরন্ধর ট্যাকটিসিয়ান। ফুটবল বিশ্বে বহু কোচ তাঁকে গুরু মানেন। স্পেন ম্যাচ তিনি ড্র রাখতে পারলেই দেখা হতো আর্জেন্তিনা-উরুগুয়ের। সেই চেষ্টায় স্ট্র্যাটেজিতে কোনও ভুল ছিল না তাঁর। উইং থেকে কাট করে ইয়ামালের দৌড় বন্ধ করে দিতে পারলে যে স্পেনকে দিশেহারা করে দেওয়া যায়, দেখাচ্ছিল উরুগুয়ে। দে লা ফুয়েন্তের টিম অসংখ্য পাস খেললে কী হবে, অ্যাটাকিং থার্ডে এসে জায়গা পাচ্ছিল না।
স্পেনের একমাত্র গোলটা পুরোপুরি ভাগ্যের জোরে। গোলকিপারের দোষে। আলেক্স বায়েনার যে শটটা গোলকিপার মুসলেরার হাতে লেগে গোলে ঢুকল, এই পর্যায়ে তো বটেই, যুব ফুটবলেও গোল হয় না। হাফ টাইমেই গোলকিপার মুসলেরাকে বসিয়ে দেন বিয়েলসা। ভুল লেখা হলো, মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত মুসলেরা নিজেই বসে যেতে চেয়েছিলেন বলে জানাচ্ছেন বিয়েলসা। অথচ মুসেলরা একেবারেই আনকোরা নন। চারটে বিশ্বকাপ খেলেছেন। অথচ জীবনের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচে ট্র্যাজেডি!
এই ম্যাচ স্পেনের কোচ দে লা ফুয়েন্তের জন্য অবশ্যই ‘ওয়েক আপ কল’। স্ট্রাইকার ওইয়ারসাবালকে বিধ্বংসী লাগেনি, ইয়ামাল এখনও এমবাপে বা মেসি নন। ফ্রান্সের মতো একঝাঁক বিকল্পও স্পেনের কোচের হাতে নেই। ইয়ামালের দৌড় আটকে দেওয়া গেলে নক আউটে তাঁর টিম আটকে যেতেই পারে। যেটা গ্রুপেই করে দেখিয়েছে কেপ ভের্দে।
সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপের গ্রুপে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ব্লু শার্কস বা নীল হাঙর। কেপ ভের্দে ফুটবল টিমটাকে এই নামেই ডাকা হয়।
এই অবিশ্বাস্য সাফল্য মনে করিয়ে দেয়, শাহরুখ খানের মুখে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপ। ‘বড়ে বড়ে দেশো মে অ্যাইসি ছোটি ছোটি বাতে হোতি রহতি হ্যায়।’ ভোজ়িনিয়ারা এখন বলতেই পারেন, ‘ছোটি ছোটি দেশো মে অ্যাইসি বড়ে বড়ে স্বপ্নে সচ হো যাতা হ্যায়!’