৯১-এও মেসির হাঁড়ির খবর নেন ১৮ বিশ্বকাপ কভার করা মাকাইয়া
এই সময় | ২৮ জুন ২০২৬
এই সময়: ডালাস স্টেডিয়ামের প্রেস কনফারেন্স রুমে মাইকের সামনে বসে আর্জেন্তিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। সবার আগে প্রশ্ন করার সুযোগ পেলেন এক নবতিপর ভদ্রলোক। বিশ্বকাপ কভার করতে যাওয়া অনেকেই চেনেন তাঁকে।
১৯৫৮ সাল থেকে বিশ্বকাপ কভার করছেন, তাঁকে না চিনে উপায় আছে? বিশ্বকাপের সঙ্গে চিরকালীন সখ্য তৈরি করে ফেলা আর্জেন্তিনার ৯১ বছরের সাংবাদিক এনরিকে মাকাইয়া মার্কেস জিজ্ঞাসা করলেন, লিওনেল মেসি কি জর্ডনের বিরুদ্ধে রবিবার খেলবেন? স্কালোনি হাসতে হাসতে জবাব দেন, ‘এই প্রশ্নটা অন্য কেউ করলে আমি ডজ করেই চলে যেতাম। কিন্তু প্রশ্নটা যখন আপনি করছেন, তখন এর উত্তর দেব। মেসি কাল বেঞ্চে থাকবে।’ বাকি সাংবাদিকদের উদ্দেশে স্কালোনি বলেন, ‘উনি ১৮তম বিশ্বকাপে এসেছেন। অবিশ্বাস্য! আমি যখন ছেলেবেলায় খেলছি, তখনই উনি আর্জেন্তিনীয় মিডিয়ায় উজ্জ্বল তারকা। এখন তো আরও বড়।’
আর্জেন্তিনা ও রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি আলফ্রেদো দি স্তেফানো যাঁকে বন্ধু মনে করতেন, যিনি ব্রাজ়িলের পাঁচটি ও আর্জেন্তিনার তিনটি বিশ্বকাপ জয়ই চাক্ষুষ করেছেন, যাঁর জন্য দিয়েগো মারাদোনা সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন— তাঁর জন্য স্কালোনি প্রথা ভাঙবেন, এই তো স্বাভাবিক। মাকাইয়া নামে বেশি পরিচিত এই সাংবাদিকের প্রথম কাজ রেডিওয়। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন রেডিও বেলগ্রানোর হয়ে। পরে বিশ্বকাপ কভার করেছেন টিভি চ্যানেলের হয়েও। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলিতে অবশ্য রোল রিভার্সাল! তাঁকেও বসতে হয়েছে অন্য দেশের সাংবাদিকদের সামনে, সাক্ষাৎকার দিতে। ৬৮ বছর ধরে যিনি বিশ্বকাপ কভার করছেন, তাঁর গল্প কি কম আকর্ষণীয়? ৯১ বছরের কোনও সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে বেশিরভাগ সাংবাদিকই ‘স্যর’ বলে সম্বোধন করেন। তিনি শুধরে দেন, ‘স্যর আবার কী? আমরা কলিগ না?’
সাত–আট বছর বয়সে বুয়েনস আইরেসের ফ্লোরেস অঞ্চলে খবরের কাগজ বিলি করতেন মাকাইয়া। ব্রাটিশ এক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার নিউজ়পেপার স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে ছিল দি স্তেফানোর বাড়ি। আমার থেকে একটু বড় (আট বছরের বড়) ছিল। আমার স্টলে কাগজ কিনতে এসে আলাপ। তারপরে আমাকে বাড়ি নিয়ে যেত, একসঙ্গে খেলতাম। আমার বন্ধুই হয়ে গিয়েছিল।’
হাইস্কুলে থাকাকালীন রেডিওয় প্রথম কাজের সুযোগ। ২৪ বছর বয়সে পাড়ি দেন সুইডেনে, ১৯৫৮ বিশ্বকাপ কভার করতে। মাকাইয়ার কথায়, ‘সে বারই পেলের উঠে আসা। স্কিল ও শারীরিক সক্ষমতায় পেলে ফেনোমেনন। খেলার ধরনটাই বদলে দিয়েছিল।’ তবে ফাইনালে পেলের হ্যাটট্রিক নয়, মাকাইয়ার মনে বেশি গেঁথে গিয়েছিল চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে আর্জেন্তিনার ১–৬ হার। বলেছিলেন, ‘বুয়েনস আইরেস বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময়ে লোকে কয়েন ছুড়েছিল প্লেয়ারদের দিকে।’
আবার সেই মাকাইয়াই আর্জেন্তিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতার পরে মেক্সিকো সিটি থেকে বুয়েনস আইরেস ফিরেছিলেন কোচ, ফুটবলারদের সঙ্গে এক বিমানে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আগে থেকেই আর্জেন্তিনার কোচ কার্লোস বিলার্দোর সঙ্গে দোস্তি হয়ে গিয়েছিল তাঁর। মাকাইয়া বলেন, ‘বিমানে বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।’
১৯৮৯ সালে নিমন্ত্রিত হন মারাদোনার বিয়েতে। তবে মারাদোনার সঙ্গে বিবাদও হয়েছিল কয়েকবার। ৮৬–তে ইংল্যান্ড ম্যাচে মারাদোনার কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলকে আর্জেন্তিনার ফুটবলার, সাধারণ ভক্ত ও মিডিয়ার একাংশ ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে তুলে ধরেছিল। মাকাইয়া গলা মেলাননি। বলেছিলেন, ‘আমি খেলার বিশ্লেষণ করি। খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে মেলানোর পক্ষপাতী নই। মারাদোনা এ নিয়ে পরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে আমাকেই ‘সঠিক’ বলেছিল।’
‘ডাইরেক্টিভি’, ডিস্পোর্টস, ডিস্পোর্টস রেডিওর জন্য ম্যাচের বিশ্লেষণ করতে তিনি এখন ইউএসএ–তে। রোনাল্দো–মেসিদের তুলনায় অনেক যোজন অতিক্রম করে মাকাইয়াও যেন প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করছেন, ‘এজ ইজ় জাস্ট আ নাম্বার।’