অস্ত্র ছেড়ে সস্ত্রীক ঘরে আসুক, ১৪ বছর পর মাওবাদী ছেলেদের কাছে আর্জি দুই পরিবারের
প্রতিদিন | ২৯ জুন ২০২৬
ঘরে ফিরিয়ে আনতে কারও বাবা, আবার কারও ভাই গিয়েছিলেন সারান্ডায়। দিনের পর দিন এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গল ঘুরে বেড়িয়েও ছেলের সন্ধান পাননি বাবা। ভাই খোঁজ পাননি দাদার। পাঠাতে পারেননি কোন বার্তাও। এদিকে গত ১৮ মে ছত্তিশগড়ের বস্তারে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভারতকে ‘মাওবাদী মুক্ত’ বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু মাওবাদীদের বঙ্গ ব্রিগেড এখনও জঙ্গলে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১৪ বছর পর আবার তারা বাড়ির কাছাকাছি আসায় তাদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরাতে কাতর আবেদন জানাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের কাতর আর্জি, ”আগ্নেয়াস্ত্র সরকারের কাছে জমা দিয়ে ঘরে ফিরে আয়।”
মাওবাদীদের বঙ্গ ব্রিগেডে যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে দুই দুর্ধর্ষ কমান্ডার রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে শচীন ও সাগর সিং ওরফে বীরেন ওরফে রবি। তাদের দু’জনেরই বাড়ি ঝাড়খণ্ডের দলমা পাহাড় রেঞ্জ এলাকায়। রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ঝাড়খণ্ডের সারান্ডা থেকে তাড়া খেয়ে ১০-১২ জনের সশস্ত্র মাওবাদী স্কোয়াড বাংলার অভিমুখে দলমা পাহাড় বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ডেরা বাঁধতে পারে। এই সতর্কবার্তা ছড়াতেই শচীন ও বীরেনের পরিবার ছেলেদের ঘরে ফেরানোর অনুরোধ জানিয়েছে। তাতে কি সাড়া দেবে শচীন-রবিরা? নাকি জঙ্গলমহল লাগোয়া ঝাড়খণ্ডে নতুন করে কোনও অশনি সঙ্কেত? রাজ্যের জঙ্গলমহলের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিস্তীর্ণ দলমা পাহাড় রেঞ্জ জুড়ে ঝাড়খণ্ড পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মিলিয়ে চিরুণি তল্লাশি চলছে। এরিয়া ডমিনেশন চলছে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়তলি এলাকাতেও। সন্দেহজনক কাউকে দেখা গেলে ফোন নম্বর সম্বলিত ইনফরমেশন স্লিপ দিয়ে পুলিশকে জানানোর কথাও বলা হয়েছে ওই এরিয়া ডমিনেশন থেকেই।
রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে শচীনের বাড়ি দলমা পাহাড় ঘেঁষে থাকা পূর্ব সিংভূম জেলার পটমদা থানার ঝুঁঝকা গ্রামে। সাগর সিং ওরফে বীরেন ওরফে রবির বাড়ি সরাইকেলা-খরসোওয়া জেলার নিমডি থানার টেঙাডি গ্রামের বেনাডি টোলায়। সেই ২০০৬ সালে মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে পটমদা হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় ঘর ছেড়েছিলেন রামপ্রসাদ। স্কোয়াডে গিয়ে তার নাম হয়েছিল শচীন। সেই যে জঙ্গলে যান আর ঘরে ফেরেননি তিনি। ঝাড়খন্ড পুলিশ তাদের ঘর ভেঙে দিলেও মাও কমান্ডার হয়ে ওঠা শচীন ঘরে পা রাখেননি। পার্টির আদর্শেই বুক চিতিয়ে লড়ছেন জঙ্গলে। নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ার মেয়ে মিতার সঙ্গে স্কোয়াডে থেকেই ‘কমরেড ম্যারেজ’ হয়। শচীনের মা পানেশ্বরী মান্ডি বলেন, ‘‘এবার ঘরে ফিরে আয় বাবা। আর কতদিন এভাবে জঙ্গলে থাকবি। আর আমাদের চিন্তা বাড়িয়ে যাবি। আমাদের যে ভয় করে। ঘরে বারবার পুলিশ আসে। ঘর ভেঙে দেয়। পুলিশের কাছ থেকেই শুনেছি বিয়ে করেছিস। বউমাকে নিয়ে ঘরে ফিরে আয়। আমরা বউমাকে মেনে নেব।”
ছলছল চোখে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ বাবা সনাতন মান্ডি বলছেন, ‘‘ছেলেটা তো স্কুলে পড়ছিল। ঠিক কবে যে ওর সঙ্গে পার্টির যোগাযোগ হলো, কবে যে চলে গেল, বুঝেই উঠতে পারছি না।” দিদি ফুলমণি বলেন, ‘‘বড় ভাইকে আমি কোলেপিঠে মানুষ করেছি। রান্না করে খাবার খাইয়ে স্কুলে পাঠিয়েছি। স্কুলে হেঁটে যেতে কষ্ট হয় বলে টাকা জমিয়ে সাইকেল কিনে দিয়েছি। বাবা আর কোনও কাজ করতে পারে না। এবার তো তোর ঘরে ফিরে আসা উচিত।” কোনওভাবে এখন সংসার টানছেন ছোট ভাই ছুটুলাল মান্ডি। কিন্তু ঘরে স্বচ্ছলতা ফেরেনি। ঝাড়খণ্ড সরকার একটা বাড়ি দিয়েছে। তাই পরিবারের আশা, ছেলে ঘরে ফিরলে সরকারের হাত ধরে সুদিন ফিরতে পারে।
সুদিন ফেরার আশায় ছেলের পথ চেয়ে বসে আছে আরেক মাও পরিবার সাগর সিংয়ের বাবা রাম সিং ওরফে ফৌজি। তিনি ও ছোট ছেলে শুকদেব দিনমজুরি করে সংসার চালান। বেনাডি টোলার একেবারে শেষ প্রান্তে তাদের এক চিলতে কুঁড়ে ঘর। অভাব নিত্য সঙ্গী। রাম সিং বলেন, ‘‘চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ঝাড়খণ্ডের সারান্ডার জঙ্গলে একসাথে ১৭ জনের মৃত্যু হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাসেই ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য সারান্ডা গিয়েছিলাম। একের পর এক জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছি। কতজন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ছেলের সঙ্গে কোনও দেখা হয়নি। কোন বার্তা পাঠাতে পারিনি। কিছুদিন আগে যখন শুনলাম দলমা এসেছে তখনও যোগাযোগ করি। কিন্তু কোন সাক্ষাৎ হচ্ছে না। আমাদের কষ্ট যদি বুঝতে পারে তাহলে একটাই কথা,
বাড়ি ফিরে আয়।” মাত্র ১০ বছর বয়সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ঘর ছেড়েছিলেন সাগর। শচীনের মতো তিনিও একদিনের জন্যও বাড়ি ফেরেননি। যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কোনও লাভ হয়নি। স্কোয়াডেই সঙ্গী বেছেছেন সাগর থেকে কমান্ডার হয়ে বীরেন ওরফে রবি। পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডির আমকোচার মীরা পাহাড়িয়ার সঙ্গে ‘কমরেড ম্যারেজ’ হয় তার।
রবির ভাই শুকদেব বলেন, ‘‘দাদা যেদিন ঘর ছেড়েছিল সেদিন বাবা দাদার জন্য চান্ডিল থেকে স্কুলের বই কিনতে গিয়েছিল। বাড়ি এসে দাদাকে আর পাইনি। কিছুদিন আগে আমাদের এক আত্মীয়ের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যায় দাদার। তখন দাদা বলেছিল, আমাকে যেন এভাবে জঙ্গলে না খোঁজে। কোনও বিষয় থাকলে খবর পাঠাবে।” সেই খবরের আশায় দলমা পাহাড়ের কোলে অপেক্ষায় এই দুই মাও পরিবার। সকাল হয়, সন্ধ্যা হয়, পাহাড় কোলে রাত নামে। পরিবারের ঘরে ফেরার করুণ আর্জি তাদের কানে পৌঁছয় কি?