অমিত চক্রবর্তী
পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসার। নেশায় আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট তমোঘ্ন দাস। এসসি, এসটি, ওবিসি বা দুঃস্থ শ্রেণির জাল নথি বাগিয়ে যারা সরকারি চাকরি করছেন বা নানা সুবিধা ভোগ করছেন—তথ্য জানার অধিকার আইন ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তরে চিঠি চালাচালিতে ক্লান্তিহীন।
গত বছর চারেকে তাঁর এই আরটিআই–তিরে বিদ্ধ হয়ে অন্তত ১৪ জনের জাল শংসাপত্র বাতিল হয়েছে। তাঁর চিঠিপত্রের চাপে গত সপ্তাহে এক শিক্ষক হুগলির এক কলেজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ওই শিক্ষকের বোন জাল শংসাপত্র নিয়েই বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছিলেন। তিনিও কর্মস্থল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এমনকী তাঁদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে এসে জাল নথি তৈরি করে সরকারি সুযোগসুবিধা নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এমন চিঠির ঠেলায় এর আগে হাওড়া পুলিশ কমিশনারেট জাল শংসাপত্র ধরতে সিট গঠনে বাধ্য হয়েছিল, অন্তত সাত জনের জাল নথি বাজেয়াপ্তও হয়। ওই অ্যাক্টিভিস্টের স্ক্যানারে এখন এক বিসিএস অফিসার এবং সরকারি হাসপাতালের এক নার্স।
তমোঘ্ন দাস নামে ওই কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসারের অভিজ্ঞতা, সরকারি ব্যবস্থাপনায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ চাইলে আগে লেগে থাকতে হয়। তা হলে যে কাজ হয়, সেটা তিনি বুঝেছেন। এক দশক আগে নানা লোককে নানা সরকারি দপ্তরে বিধি মেনে চিঠি লেখায় সাহায্য করা দিয়ে তাঁর অ্যাক্টিভিজমের শুরু। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা বিষয়ে পরামর্শও দিতেন। আর তা করতে করতেই নজরে আসে জাল শংসাপত্র–চক্র।
এই সূত্রেই রানাঘাটের দু’জনের জাল এসটি শংসাপত্রের উল্লেখ করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর অভিযোগকে গুরুত্ব দেয় জাতীয় এসসি–এসটি কমিশনও। আবার বছর দু’য়েক আগে দু’টি ঠিকানায় সাত জনের নামে তফসিলি জাতি–উপজাতি শংসাপত্র ইস্যু হওয়ার অভিযোগ নিয়ে তিনি প্রথমে তথ্য জানার অধিকার আইনে চিঠি ও পরে বিভিন্ন দপ্তরে নথি পাঠানো শুরু করেন। এ বারও জাতীয় এসসি–এসটি কমিশন হস্তক্ষেপ করে।
কমিশন হাওড়ার পুলিশ কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। এক আইপিএসের নেতৃত্বে সিট গঠন করে তদন্ত শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সাত জনেরই শংসাপত্র জাল বলে চিহ্নিত হয়। একই ভাবে ঝাড়গ্রাম মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক পড়ুয়ার জাল উপজাতি শংসাপত্র বাতিল হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার এক ডব্লিউবিসিএস অফিসার ও সরকারি হাসপাতালের এক নার্সের বিরুদ্ধেও একই রকম জাল শংসাপত্র ব্যবহার করে কোটায় চাকরির অভিযোগে তাঁর লড়াই চলছে।
এই লড়াই চালাতে গিয়ে হামলার মুখেও পড়েছেন তমোঘ্নবাবু। হাওড়ার ঘটনায় তদন্তের মধ্যেই জাতীয় এসসি–এসটি কমিশন তাঁকে নিরাপত্তা দিতে পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেয়।
ওই অ্যাক্টিভিস্টের বক্তব্য, ‘রাজ্যের আগের সরকারের আমলে ২০১৩–য় জনপরিষেবা আইন চালুর পরে আবেদনের ২৮ দিনের মধ্যে শংসাপত্র দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার পর থেকে দেদার জালিয়াতি হয়েছে। ন্যূনতম বিধি না মেনে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দেখে, কোনও ভেরিফিকেশন ছাড়াই যথেচ্ছ সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে।’ তাঁর হাতে এমন লোকেরও নথি রয়েছে, যিনি এসসি থেকে ওবিসি—সব রকম শংসাপত্রই পেয়েছেন!