• ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতল, ফরেস্টে হাই অ্যালার্ট জারি
    এই সময় | ২৯ জুন ২০২৬
  • এই সময়: পূর্বাভাস ছিল আগেই। টানা ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত পাহাড় ও সমতল। আজ, সোমবার উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলায় লাল সতর্কতা রয়েছে। তার আগে শনিবার রাতের বৃষ্টিতে বেহাল দার্জিলিং, কালিম্পং ও সিকিম। ফের অতি ভারী বৃষ্টির জেরে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে তা নিয়ে উদ্বেগে প্রশাসন। শনিবার রাতে প্রবল বৃষ্টির জেরে মিরিকের গয়াবাড়িতে ধস নেমে শিলিগুড়ি-মিরিক সড়ক বন্ধ হয়ে যায়।

    রবিবার দুপুরে সেই ধস সারানোর পরে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কিছুদিন আগেই দুধিয়ায় বালাসন নদীর উপরে তৈরি ডাইভারশন জলের তোড়ে উড়ে যাওয়ায় এখনও শিলিগুড়ি-মিরিক সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা যায়নি। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি ফুটওভার ব্রিজ তৈরি করে কোনও রকমে যোগাযোগ সচল রাখা হয়েছে। যান চলাচলের জন্য একটি বেইলি ব্রিজ তৈরি হচ্ছে। তার মধ্যে গয়াবাড়ির ঘটনায় উদ্বিগ্ন মিরিকের বাসিন্দারা। স্বস্তিতে নেই সিকিমের বাসিন্দারাও।

    শনিবার রাতে মঙ্গনে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। তার জেরে ফিদাংয়ে ফিখোলার উপরে তৈরি বেইলি ব্রিজ জলের তোড়ে ভেসে যায়। ফলে মঙ্গন থেকে জোঙ্গুর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। উত্তর সিকিমের নানা এলাকায় ধস নেমেছে। ছোট, বড় রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মূল সড়কগুলি এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাতের জেরে ধস নামলে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ এবং সিকিমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

    রাতভর বৃষ্টির জেরে এ দিন তিস্তা এবং মহানন্দার জলস্তর বেড়ে যায়। অতিবৃষ্টির জেরে জলমগ্ন হয়ে পড়ে শিলিগুড়ি লাগোয়া ফুলবাড়ি এবং খাপরাইল এলাকা। মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিজেপি বিধায়ক আনন্দময় বর্মন খাপরাইলে জলমগ্ন এলাকার পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করে তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেন, 'কী ভাবে মানুষকে এই জলযন্ত্রণা থেকে রেহাই দেওয়া যায় সেটা রাজ্য সরকার খতিয়ে দেখছে।'

    প্রবল বৃষ্টিতে কালজানি, তোষা, বাসরা, পানা-সহ জেলার ছোট বড় সব নদী ফুঁসছে। আলিপুরদুয়ারে কালজানি নদীতে হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তোর্ষা নদীর জল বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সেচ দপ্তর নজরদারি শুরু করেছে। কালজানি ফুলেফেঁপে ওঠায় আলিপুরদুয়ার শহরের পাশে নদীবাঁধের ১৪টি সুইস গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে নদীর জল শহরে ঢুকে বিপত্তি না বাড়াতে পারে। আলিপুরদুয়ার ও ফালাকাটা পুরসভার একাধিক ওয়ার্ড জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

    সেচ দপ্তর সূত্রে খবর, গত ২৪ ঘণ্টায় আলিপুরদুয়ারে ১৭৭.৪০ ও হাসিমারায় ১৬০.২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আলিপুরদুয়ার পুরসভার ৯, ১৫ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে মোট পাঁচটি নৌকো নামানো হয়েছে। ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কংগ্রেস কাউন্সিলার শান্তনু দেবনাথ বলেন, 'শহরের নিকাশী ব্যবস্থার উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যানের দাবি করলেও আমাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে বৃষ্টি হলেই শহরের মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়ে। ২০ ওয়ার্ডে জল থই থই করছে।' শহরের জমা জল কালজানি নদীতে ফেলতে পুরসভার তরফে বিদ্যুৎ ও ডিজেল চালিত মোট ১০টি পাম্পসেট চালানো হচ্ছে। তাতেও দুপুর দু'টো পর্যন্ত শহরের জল যন্ত্রণা কাটেনি। পুরসভার চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ কর ও ভাইস চেয়ারম্যান মাম্পি অধিকারী ইস্তফা দেওয়ায় পুরসভা এখন অভিভাবকহীন।

    ফালাকাটা পুরসভার ১, ৭, ১০ ও ১৭ নম্বর-সহ একাধিক ওয়ার্ড জলমগ্ন। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান ইস্তফা দেওয়ায় সমস্যার কথা কোথায় জানাবেন, বুঝতে পারছেন না পুরসভার বাসিন্দারা। এদিকে, হাউড়ি, তিতি ও বাংরি নদীর জলস্ফীতির কারণে মাদারিহাট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে ২২ কিলোমিটার দূরের টোটোপাড়া। জলদাপাড়া ট্যুরিস্ট লজের পার্কিং লটের উপর দিয়ে বইছে হলং নদী। জয়গাঁর গোবরজ্যোতি নদীর জলে একটি ডাইভারশন উড়ে গিয়েছে।

    ভুটানের ফুন্টসোলিং শহরের একটি গ্যাস গোডাউন থেকে রান্নার গ্যাসের ৫০০টি সিলিন্ডার তোর্সা নদীতে ভেসে গিয়েছে। জলঢাকা নদীর জলে প্লাবিত হয়েছে রামসাই ও আমগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের বেশ কিছু গ্রাম। আমগুড়ি গ্রামের জলঢাকা সংলগ্ন বেতগাড়া, দাসপাড়া, খরিবাড়ি, খাটোরবাড়ি এলাকায় বহু পরিবার জলবন্দি। রবিবার ভোর থেকেই তিস্তার জল ঢুকতে শুরু করে ক্রান্তি ব্লকের চাঁপাডাঙা ও চ্যাংমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন গ্রামে। আটকে পড়েছে পাঁচশো পরিবার। দক্ষিণ চ্যাংমারি শিশুশিক্ষা কেন্দ্র ও পশ্চিম শেংপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় জলের তলায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গা-ঘেঁষে থাকা গ্রামের মূল রাস্তা ভেঙে গিয়েছে। গোরুমারা ফরেস্টে হাই অ্যালার্ট জারি হয়েছে।

    কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন রায়গঞ্জ শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা। বৃষ্টি থামার ১২ ঘণ্টা পরেও জল না-নামায় একাধিক জায়গায় পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, শনিবার সন্ধ্যায় হওয়া ঝড়-বৃষ্টির পর থেকেই শহরের বেশিরভাগ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে ড্রেন পরিষ্কার না হওয়া, অপরিকল্পিত নিকাশি ব্যবস্থা এই পরিস্থিতি। পথ অবরোধ ও বিক্ষোভের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় রায়গঞ্জ থানার পুলিশ ও রায়গঞ্জ পুরসভার স্যানিটরি বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার সৌম্যদীপ কুণ্ডু। তিনি বলেন, 'শ্রমিক-সংক্রান্ত কিছু সমস্যার কারণে জল নিষ্কাশনের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে।' বিধায়ক তথা মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেন, 'অল্প বৃষ্টিতেই রায়গঞ্জ শহরে জল জমছে। সাধারণ মানুষকে কী ভাবে মুক্তি দেওয়া যায় আলোচনা হয়েছে।'

    কোচবিহারে তোর্সা নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় জেলার বেশ কিছু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। রবিবার কোচবিহার উত্তর বিধানসভার মধুপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের হরিপুরে এলাকা পরিদর্শনে যান বিধায়ক সুকুমার রায়। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে ত্রিপল-সহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। কোচবিহার শহরেও এ দিন সকালে একাধিক ওয়ার্ড জলমগ্ন হয়ে পড়ে। দিনহাটা, সিতাই-সহ একাধিক গ্রামীণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

    (তথ্য: সঞ্জয় চক্রবর্তী, পিনাকী চক্রবর্তী, সুজিত রায়, অর্ঘ্য বিশ্বাস, নীলাঞ্জন দাস ও চাঁদকুমার বড়াল)

  • Link to this news (এই সময়)