• পুলিশকে টেবিলের তলা থেকে বের করে গুন্ডাদের মাটির তলায় ঢোকানোর বিল: শঙ্কর ঘোষ
    এই সময় | ২৯ জুন ২০২৬
  • গুন্ডাদমন বিল নিয়ে বিধানসভায় চলছে জোর বিতর্ক। বিলের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি সাজিয়েছেন শাসক-বিরোধী বিধায়করা। দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল এবং দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট বিল- এই দুটি বিল মার্জ করে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনায় অংশ নিয়েছেন শঙ্কর ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নৌশাদ সিদ্দিকি-সহ অনেকেই।

    আইএসএফ বিধায়ক নৌশাদ সিদ্দিকি প্রথমেই বলেন, ‘প্রতিবাদের নামে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি সম্পত্তি নষ্ট করলে ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে।’ সরকারি সম্পত্তি নষ্টে ক্ষতিপূরণ নেওয়াকে সমর্থন জানালেও তাঁর আশঙ্কা, ‘যেন কোনও পার্শিয়ালিটি না হয়। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে যেন হয়।’ কিন্তু গুন্ডাদমন বিল নিয়ে একাধিক আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তিনি। নৌশাদ সিদ্দিকি বলেন, ‘এই আইনকে কি দমনমূলক হাতিয়ার করা হবে? ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে? পুলিশের স্বেচ্ছাচারিতার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে?’ বক্তব্য রাখতে গিয়ে ২ বছর আগে বারুইপুর পুলিশ জেলায় এক সপ্তাহে ৫ জনের হেফাজতে মৃত্যুর প্রসঙ্গ তোলেন তিনি।

    নৌশাদের প্রশ্ন, ‘শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার ও আটকের কথা বলা হচ্ছে। এই সন্দেহ কাদের উপর হবে? যাঁরা বিরোধী মত পোষণ করছেন নাকি সত্যি যাঁরা গুন্ডামি করছেন?’ পোটা ও মিসা আইনের প্রসঙ্গ তুলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভাঙড়ের বিধায়ক। তার সঙ্গে নৌশাদ বলেন, ‘আত্মবিশ্বাসী সরকারের গোপন তালিকা বা বিনা বিচারে আটকের মতো পদক্ষেপের মতো প্রয়োজন হয় না।’ এই বিল নিয়ে জনশুনানি করানোর দাবি তুলেছেন নৌশাদ। বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবিও তুলেছেন তিনি।

    বিলের পক্ষে বলতে গিয়ে ২০০৬ সালে বিধানসভা ভাঙচুরের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ। বিধানসভার আসবাবপত্র ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। এ দিন শঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘যাঁরা আমাদের শৃঙ্খলা শেখাতে এসেছেন, তাঁরা এই বিধানসভা ভাঙচুর করে সরকারি সম্পত্তি কী ভাবে নষ্ট করা যায়, তার প্রমাণ তারা নিজেদের কাজের মধ্যে দিয়েছিলেন।’ তাঁর মতে, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করা অপরাধ নয় এমন মানসিকতা সমাজ থেকে মুছে ফেলতে হবে। নয়তো আন্দোলনের নাম করে ট্রেন জ্বালানো, বাস জ্বালানো এবং নৈরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। মন্ত্রী বলেন, ‘করের টাকায় তৈরি সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের মানসিকতা রোখার জন্য এই আইন জরুরি।’

    তাঁর আরও সংযোজন, ‘নানা জায়গায় দেখেছি এক শ্রেণির মানুষ সরকারি সম্পত্তি লুট করেছে, ধ্বংস করেছে। তারা ভেবে নিয়েছে তাদের কিছু করা হবে না। এই বিলের বিরোধিতা করা মানে, সেই কাজগুলি করে এসেছেন তারা।’ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার মধ্য দিয়ে পুলিশের হাতে যে আইন রয়েছে, সেই আইন এই সংস্কৃতিকে রোখার জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে মন্তব্য মন্ত্রীর। পশ্চিমবঙ্গের আগে অনেক রাজ্যে এই বিল এসেছে, উত্তরবঙ্গে, গুজরাট, কেরালা, রাজস্থানে গুন্ডাদমন করার জন্য এমন বিল রয়েছে বলে বিধানসভায় জানালেন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ। তৃণমূল আমলে এমন একাধিক ঘটনা দেখা গিয়েছে, যেখানে দুষ্কৃতীদের হামলায় পিছু হঠতে দেখা গিয়েছে পুলিশকে। সেই প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘গত শাসকের আমলে পুলিশকে টেবিলের তলায় লুকোতে বাধ্য করেছে, এই বিল পুলিশকে টেবিলের তলা থেকে বের করে গুন্ডাদের মাটির তলায় ঢোকানোর বিল।’ নৌশাদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি জানান, আন্দোলনের অধিকার মৌলিক অধিকার কিন্তু সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করার এই রাজ্যে থাকবে না।

    বিলের খুঁটিনাটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল বিধায়ক প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রশ্ন, বলা হচ্ছে পুলিশ সন্দেহের ভিত্তিতে কোনও পদক্ষেপ করতে পারে। কাউকে নিয়ে সন্দেহ হলে, পুলিশ যদি পদক্ষেপ করতে পারে, তাহলে আমরা কী পুলিশ স্টেট তৈরি করছি।

    বিল নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি জানান, সরকারি সম্পত্তির পাশাপাশি বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষেত্রেও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কারও দোকান ভাঙা হলে, কারও বাড়িতে আগুন লাগানো হলে, ব্যবসা নষ্ট হলে তিনি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন।’ এই আইন প্রতিহিংসার জন্য নয় বলে আশ্বাস তাঁর। তিনি বলেন, ‘আইন ভাঙার আগে অপরাধী দশ বার ভাববে। এই আইন নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে নয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের বিরুদ্ধে নয়। গণতন্ত্রের নামে যারা নৈরাজ্য করতে চায়, রাষ্ট্রের সম্পত্তি ধ্বংস করে, তাদের জন্য এই আইন।’

  • Link to this news (এই সময়)