বইমেলা। বাঙালির চোদ্দতম পার্বণ বলেই পরিচিত ইদানিংকালে। তবে রাজ্যে পালাবদলের পর, এই চোদ্দতম পার্বণে কিছুটা বদল আসতে চলেছে, বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। এবার কি তবে বদল বইমেলাতেও? গুঞ্জনের উত্তর মিলতে পারে মহাজাতি সদনে, আশা ছিল তেমনটাই। বুদ্ধদেবের হাত ধরে, বইমেলার ভবিষ্যত কি নির্ধারিত হল আজই?
প্রথমেই বলা যাক, গুঞ্জনের কারণ কী? গুঞ্জনের কারণ, গিল্ড নিয়ে একাংশের ক্ষোভ এবং রাজ্যে পালাবদলের পরেই এক নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ। লক্ষ্য , কোনও বিশেষ সংগঠনের একাধিপত্য নয় আর বইমেলায়। যা হবে, হবে লেখক, প্রকাশক, মুদ্রক, এবং সকল সংগঠন, সকলকে মিলে, যাতে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জায়গা আর না থাকে। মুদ্রক, প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতার মহাসংঘ, বঙ্গীয় গ্রন্থ শিল্প পরিষদ নামের ওই সংগঠন, আত্মপ্রকাশের পরেই, সোমবার, ২৯জুন মহাজাতি সদনে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট চিন্তক জিষ্ণু বসু, রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার, কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহর কন্যা মালিনী গুহ, এই সংগঠনের সভাপতি নির্গুণানন্দ ব্রহ্মচারী, সপ্তর্ষি চৌধুরী-সহ গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি- ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়, সুধাংশু শেখর দে এবং একাধিক সাহিত্যিক, প্রকাশক। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বুদ্ধদেব গুহ, তাঁর সাহিত্য, তাঁর ভাবনা, তাঁর সৃষ্টি অবশ্যই। তবে, উপনিষদ, যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়মাবলী, রবীন্দ্রনাথ, রবিসাহিত্য, জল জঙ্গল মানুষের জীবনের পদাতিক লেখক বুদ্ধদেব গুহ, রাজনীতির চিন্তক বুদ্ধদেব গুহ, দৃঢ়চেতা বুদ্ধদেবগুহ এবং সকলের মত প্রকাশের সমান অধিকারের অঙ্গীকারের হাত ধরেই এক সময়ে আলোচনা ঠিক পৌঁছে যায় বইমেলাতেই।
রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের কথায় যেমন উঠে এল প্রকাশকদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের কথা, দীর্ঘ ব্রিটিশ সময় পেরিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শাসনকালের কথা, তেমনই এল বইমেলার কথা। তিনি বলেন, বইমেলা, প্রকাশনী, নাটক, নাট্যশিল্প কোনও জায়গায় মুক্ত চিন্তা প্রকাশের কোনও বাধা থাকবে না। তাঁর মতে, মুক্ত চিন্তা ছাড়া শিল্প হয় না। এবার তার সূচনা হবে। আসন্ন বাংলার, ভারতের গর্ব আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলার ৫০ তম আয়োজনে সেই ভাবের প্রকাশ দেখা যাবে, একত্রিতভাবে, আশাবাদী তিনি।
অন্যদিকে বইমেলার ৫০ বছরের প্রাক্কালে একগুচ্ছ আর্জি বুদ্ধদেব গুহর কন্যা মালিনী গুহর গলায়। একদিকে যেমন নিজের শৈশবকালের কথা মনে করে, তিনি গড়ের মাঠে অর্থাৎ ময়দানে আবার এই বইমেলা ফেরানোর দাবি জানালেন, দাবি জানালেন গ্রামীণ বইমেলাগুলির দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার। তেমনই দীর্ঘকাল ধরে বইমেলার দায়িত্ব সামলানো গিল্ডের প্রশংসা করেও, কিছুটা যেন বার্তা দিলেন নয়া সংগঠন এবং পুরোনো সংগঠনের একত্রিত হয়ে চলারও। তিনি বলেন, '৫০ বছরে, যারা এতদিন ঝড়ে-জলে, বইমেলা আগলেছেন, তাদের সঙ্গে যদি নতুনরাও যুক্ত হোন, তাহলে বইমেলাকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এখনও অনেকদূর যাওয়ার আছে।'
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য আবার রাজনীতি থেকে বইমেলার নীতি অতি সহজ ভাষাতেই বললেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলার বইমেলা গোটা দেশের আবেগ। এই বইমেলাতে লাইন দিয়ে পাঠক বই কেনেন, আন্তর্জাতিক বইমেলায় ভারতীয়ত্ব থাকুক, আর্জি শমীকের। একইসঙ্গে তিনি বলেন, একাধিক বিষয়ে এই মেলা নিয়ে ক্ষোভ থাকে। সংগঠনে বিচ্যুতি কাঙ্খিত না হলেও, তা ঘটেই থাকে। সেই জায়গা কাটিয়ে উঠতে হবে। সমাজে মত প্রকাশের অধিকারের কথা মনে করিয়ে দেন শমীক, মনে করিয়ে দেন শিল্পক্ষেত্রে রাজনীতিকরণ না করার বিষয়টিও।
উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশে তাঁর সংযোজন, 'পশ্চিমবঙ্গে এতদিন যে দল সরকারে এসেছে, সেই দলের হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু এখন এমন একটি সরকার তৈরি হয়েছে যারা কোনও দলের সরকার হবে না, মানুষের সরকার হবে। আজ এখানে আমি দলের প্রতিনিধিত্ব করছি। কিন্তু সরকারের কোনও প্রতিনিধিত্ব থাকলে ভাল হত। আপনাদের অনেকের অনেক অভিযোগ আছে, অভিমান আছে। সরকারের প্রতিনিধি থাকলে আপনার তাঁদের কাছে তুলে ধরতে পারতেন।" একইসঙ্গে বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত প্রত্যেকের। বিরুদ্ধ মতকে স্বাগত জানানোর বার্তা দিলেন ধীর বক্তব্যে। বলেন, 'আমরা চাই যে কোনও ভাবনার সাহিত্য চর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ এবং জায়গা থাকা উচিত। একজন বামপন্থী মানুষ মার্ক্সীয় সাহিত্য চর্চা করবেন, বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।'
কিন্তু যে সংগঠনকে ঘিরে এত কথা, তার উৎপত্তি কোথায়? অনির্বাণ দে জানাচ্ছেন, এই ভাবনা তাঁদের বহুবছরের। মূলত আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রবাদ, বহুত্ববাদ থেকেই জন্ম এই ভাবনার। তবে সংগঠন আকারে আত্মপ্রকাশ ১ জুন। ২০ জুন সংগঠনটি পালন করেছে পশ্চিমবঙ্গ দিবস। এবার বুদ্ধদেব গুহর জন্মদিবস পালনের মধ্যে দিয়ে আবার প্রকাশ্যে।
কিন্তু এই সংগঠনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী? গুঞ্জন অনুযায়ী কি তারা এবার রাশ ধরতে চাইছে বইমেলার? অনির্বাণ জানাচ্ছেন, সেটা 'লজিক্যালি' সম্ভব নয়। কারণ গিল্ড ১৮টি প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে গঠিত একটি বেসরকারি সংগঠন। বঙ্গীয় গ্রন্থ শিল্প পরিষদও তাই। পার্থক্য, গিল্ড, কেবল কলকাতা কেন্দ্রিক কিছু প্রকাশনা সংস্থাকে নিয়ে তৈরি, নতুন সংগঠন ছাতার তলায় আনছে জেলার প্রকাশনা সংস্থাগুলিকেও। কিন্তু একটি বেসরকারি সংগঠন, অপর বেসরকারি সংগঠনকে সরিয়ে জায়গা নিতে পারে না। ফলে চলতে হবে একত্রিতভাবে। সরকার কি রাশ ধরতে পারে বইমেলার? তেমন প্রশ্নও ঘুরেছে সন্ধেভর।
এই পরিস্থিতিতে কী বলছেন গিল্ডের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক? ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলছেন, তিনি কার্যত মুগ্ধ শমীকের বক্তব্যে। তিনি বইমেলা বিতর্ক এড়িয়ে, মনোনিবেশ করছেন, বুদ্ধদেব প্রসঙ্গে। অন্যদিকে সুধাংশু শেখর দেও মনোনিবেশ করছেন বুদ্ধদেবেই। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তাঁর চোখের সামনে। সঙ্গে অবশ্য এও বলছেন, গিল্ড বইমেলা নিয়ে যা বলার, সবসময় বলেছে সাংবাদিক বৈঠক করে। সোম সন্ধ্যায় শুনেছেন নানা বিষয়, মতামত। এটুকুই।