• অন্নপূর্ণা যোজনার কারণে স্ত্রীকে নৃশংস খুন!
    আজকাল | ৩০ জুন ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্র পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে বিবাদ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম দাম্পত্য কলহ। শেষমেশ মর্মান্তিক পরিণতি। টানা চার থেকে পাঁচ দিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি চলছিল। 

    রবিবার গভীর রাতে ৯ বছরের ছেলের সামনেই স্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠল স্বামীর বিরুদ্ধে। এরপর নিজেই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে সোনামুখী থানার ডিহিপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের আলমপুর গ্রামে।

    পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত গৃহবধূর নাম অম্বিকা দাস (৩০) এবং তাঁর স্বামীর নাম মানস দাস (৪৪)। দীর্ঘদিন ধরেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক অশান্তি চলছিল বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের। একে অপরকে সন্দেহ করা, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ- প্রায়ই বাড়িতে অশান্তির পরিবেশ তৈরি হতো।

    সম্প্রতি অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্র পূরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথির প্রয়োজন ছিল অম্বিকার। অভিযোগ, সেই নথি দিতে অস্বীকার করেন মানস। এই বিষয়টি নিয়েই গত কয়েক দিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বচসা ক্রমশ বাড়ছিল।রবিবার গভীর রাতে আচমকাই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। 

    অভিযোগ, মানস দাস বাড়িতে থাকা মাংস কাটার ধারালো অস্ত্র হাতে নিয়ে স্ত্রীর উপর চড়াও হন। অপ্রস্তুত অবস্থায় অম্বিকার উপর এলোপাথাড়ি কোপ মারেন তিনি। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অম্বিকা। মাকে বাঁচাতে ছুটে আসে তাঁদের ৯ বছরের ছেলে। বাবাকে ঠেকাতে গিয়ে সেও আহত হয়। এরপর সে দ্রুত বাড়ির অন্য সদস্যদের খবর দেয়। 

    পরিবারের সদস্যরা ছুটে এসে দেখেন, অম্বিকা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। চারিদিকে রক্তারক্তি কাণ্ড। পরিবারের দাবি, তাঁরা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছন, তখনও পরিস্থিতি ভয়াবহ। এর মধ্যেই অভিযুক্ত মানস দাস বাড়ির ভিতরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগ। পুলিশ পৌঁছনোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

    খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় সোনামুখী থানার পুলিশ। পুলিশ এসে রক্তাক্ত অবস্থায় অম্বিকার দেহ উদ্ধার করে। একইসঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় মানসের দেহ। পরে দু’টি মৃতদেহই ময়নাতদন্তের জন্য বাঁকুড়া সম্মেলনে মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

    পরিবারের সদস্য বিভাষ মণ্ডল জানান, “ওঁদের মধ্যে প্রায়ই অশান্তি হতো। মানসের মানসিক সমস্যা ছিল। দুর্গাপুরে চিকিৎসাও চলছিল। অন্নপূর্ণা যোজনার নথি নিয়ে কিছু অশান্তি হয়েছিল ঠিকই, তবে দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্বই বড় কারণ বলে মনে হচ্ছে।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই ঘটনাটি হঠাৎ কোনও একদিনের উত্তেজনার ফল নয। দীর্ঘদিনের জমে থাকা অশান্তির প্রকাশ।

    আর এক সদস্য কল্পনা বাগ বলেন, “অম্বিকা আবেদনপত্র পূরণের জন্য স্বামীর কাছে কিছু নথি চাইছিল। কিন্তু মানস তা দিচ্ছিল না। এই নিয়েই গত কয়েক দিন ধরে তুমুল অশান্তি চলছিল।” পরিবার সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, আর্থিক ও পারিবারিক নানা চাপও সম্পর্কের অবনতির কারণ হয়ে উঠেছিল।

    মানসের দাদা সঞ্জয় দাস জানান, “মানস দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক সমস্যায় ভুগছিল। ওর চিকিৎসা চলছিল। এমন একটা ঘটনা ঘটবে, সেটা কল্পনাও করতে পারিনি।” পরিবারের দাবি অনুযায়ী, মানসের মানসিক অবস্থার অবনতি গত কয়েক মাসে আরও বেড়েছিল। যদিও চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও এমন চরম পদক্ষেপ কেন তিনি করলেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা।

    এদিকে ঘটনায় গুরুতর মানসিক আঘাত পেয়েছে ৯ বছরের শিশুটি। নিজের চোখের সামনে মায়ের খুন এবং বাবার আত্মহত্যা- এই নির্মম অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

    প্রতিবেশীদের বক্তব্য, পরিবারটি বাইরে থেকে স্বাভাবিক বলেই মনে হতো। মাঝে মধ্যে অশান্তির শব্দ শোনা গেলেও এমন পরিণতির কথা কেউ ভাবতে পারেননি।

    বিষ্ণুপুরের মহকুমা পুলিশ আধিকারিক অঞ্জলি সুগা জানান, “প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক অশান্তির বিষয়টি সামনে এসেছে। লিখিত অভিযোগে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ ও পারস্পরিক সন্দেহের কথা উল্লেখ রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা মানসের মানসিক চিকিৎসার বিষয়টিও জানিয়েছেন।” পুলিশ সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে। নথি সংক্রান্ত বিবাদ, দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ এবং মানসিক অসুস্থতা- সবকিছু মিলিয়েই এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনের কারণ খোঁজা হচ্ছে। বাঁকুড়ার সোনামুখীর এই মর্মান্তিক ঘটনা গোটা এলাকায় শোক ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
  • Link to this news (আজকাল)