• বয়সকে তুড়ি মেরে, কারও সাহায্য ছাড়াই ৭০ বছরেও ৫ টাকায় চপ বেচে জীবনের চাকা ঘোরাচ্ছেন এই দম্পতি
    News18 বাংলা | ৩০ জুন ২০২৬
  • : একদিকে হু হু করে ছুটে চলেছে শত শত লরি আর গাড়ি। জাতীয় সড়কের সেই গতির ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ভাঙাচোরা ছোট্ট চালার দোকান। বাইরে থেকে দেখলে হয়ত অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যাবে, কিন্তু এই ছোট্ট পরিসরেই রোজ জীবনের চাকা ঘোরাতে নীরব লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এক বৃদ্ধ দম্পতি। বয়স সত্তরের কোঠা পেরিয়েছে। বয়সের ভারে শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্লান্তি। তবু কারও কাছে হাত না পেতে, বয়সের কাছে হার না মেনে গত তিন দশক ধরে প্রতিদিন রোদ-জল-ঝড় উপেক্ষা করে নিজেদের রুটিরুজি জুটিয়ে চলেছেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বেলদা থানার সায়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মতিলাল বেরা এবং তাঁর স্ত্রী।

    বিকেল গড়ালেই উনুনে আঁচ পড়ে ওই দোকানে। গরম তেলের কড়াইতে একে একে ভাজা হতে থাকে আলুর চপ, বোম, ডিমের চপ থেকে শুরু করে মুচমুচে বেগুনি। আগুনের আঁচে বসে নিপুণ হাতে চপ ভাজেন মতিলালবাবু। আর তাঁর স্ত্রী সেই গরম তেলেভাজা কাগজের ঠোঙায় মুড়ে হাসিমুখে তুলে দেন ক্রেতাদের হাতে। এই বয়সেও কাজের প্রতি তাঁদের যে নিষ্ঠা ও উদ্যম, তা যেকোনও যুবককেও হার মানাতে বাধ্য। একে অপরের যোগ্য পরিপূরক হয়ে পরম মমতায় প্রতিদিন এভাবেই কেটে যায় তাঁদের বিকেল থেকে সন্ধে। গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটাই তাঁদের নিত্যদিনের রুটিন।

    তবে এই দোকানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শুধুই স্বাদ বা আন্তরিকতা নয়, বরং এর দাম! বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির বাজারে যখন কাঁচামাল থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল— সবকিছুরই দাম আকাশছোঁয়া, তখন এই দোকানে যেকোনও তেলেভাজা মেলে মাত্র পাঁচ টাকায়। যেখানে চারদিকে লাভের আশায় দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, সেখানে এই বৃদ্ধ দম্পতি অবাক করে দিয়ে মাত্র পাঁচ টাকাতেই বিক্রি করে চলেছেন গরম গরম চপ বা বেগুনি। লাভের অঙ্ক সামান্যই। কোনওমতে হয়ত দিন গুজরান হয়। তবু বেশি মুনাফার লোভ তাঁদের কখনও গ্রাস করতে পারেনি। ক্রেতাদের তৃপ্তির হাসি আর প্রতিদিনের চেনা মুখগুলোতেই তাঁরা নিজেদের আসল প্রাপ্তি খুঁজে নেন।

    নামমাত্র দাম এবং অসাধারণ ঘরোয়া স্বাদের টানে প্রতিদিন বিকেল হলেই দোকানে উপচে পড়ে ভিড়। জাতীয় সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা লরিচালক, গাড়ির যাত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় গ্রামের মানুষ— সকলেই এই দোকানের বাঁধা খদ্দের। গরম চপের স্বাদের পাশাপাশি সেখানে রোজ জমে ওঠে সান্ধ্যকালীন আড্ডাও। কোনও সাহায্যের আশায় বসে না থেকে, সৎ পথে কঠোর পরিশ্রম করে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড় করার যে দৃষ্টান্ত তাঁরা স্থাপন করেছেন, তা আজ গোটা এলাকার মানুষের কাছে এক বিরাট অনুপ্রেরণা। সায়াপাড়ার এই ভাঙাচোরা দোকানটি আজ শুধু মুখরোচক তেলেভাজার জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এক অদম্য জীবনসংগ্রাম, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং অল্পতে খুশি থাকার মানসিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছে।
  • Link to this news (News18 বাংলা)