• বাংলার ভাষাবিদের ইতালি জয়, সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম ভারতীয় হিসাবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার!
    প্রতিদিন | ৩০ জুন ২০২৬
  • সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যে এই প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেন এক ভারতীয় অধ্যাপক। পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাঁওতালি বিভাগের স্থায়ী সহকারী প্রফেসর ড: শ্রীপতি টুডু এই সম্মান পেলেন। ইতালির পিয়েদমোন্ত অঞ্চলে ১৮ তম আন্তর্জাতিক ওসতানা উৎসবে তরুণ লেখক হিসাবে ওসতানা পুরস্কার পান। চলতি মাসের ২৫ থেকে ২৮ জুন ওই উৎসব চলে। শেষ দিনে রবিবার এই সম্মাননা ওই অধ্যাপক তথা ভাষাবিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৪ সালে এই সম্মান পেয়েছিলেন দেশের বিখ্যাত ভাষাবিদ গণেশ এন. দেবী। সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের এই পুরস্কার দ্বিতীয় ভারতীয় এবং সাঁওতালি ভাষার ইতিহাসে প্রথম।

    সমগ্র বিশ্বজুড়ে বিপন্ন, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী মাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণ এবং সাহিত্য চর্চাকে উদযাপন করতে এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। ফি বছর ওসতানা মিউনিসিপালিটি এবং ‘চামব্রা ডক’ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই আন্তর্জাতিক উৎসবের আয়োজন করা হয়। তাঁর এই সম্মান বিশ্বমঞ্চে সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকি লিপির মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিল এমন কথাই বলছেন সাঁওতাল সমাজের মানুষজন। তাঁর কথায়, “আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের নাম তুলে ধরতে পেরেছি। তুলে ধরতে পেরেছি সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যকে। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে গর্বের।” এই অধ্যাপককে নিয়ে গর্বিত দেশ। বর্তমানে তিনি রোমে রয়েছেন। ২ জুলাই রওনা দেবেন। ৩ তারিখ ফিরবেন কলকাতায়। 

    ওই অধ্যাপক সাঁওতালি ভাষায় ভারতের সংবিধান অনুবাদ করেছিলেন। যা ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়। অলচিকি লিপিতে অনূদিত ওই গ্রন্থ সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষজনকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ২০২২ সালের ২৯ মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার মন কি বাত অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “শ্রীপতি টুডু জি দেশের সংবিধানকে তাঁর মাতৃভাষা সাঁওতালিতে অনুবাদ করে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জন্য এক ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করেছেন।”

    তাঁর আদি বাড়ি দক্ষিণ বাঁকুড়ার খাতরা থানার মুড়া গ্রামে। ২০০৪ সালে ঝিলিমিলি হাই স্কুল থেকে প্রথম ভাষা হিসেবে সাঁওতালি নিয়ে মাধ্যমিক। তারপর ২০০৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু স্মৃতি মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে সাঁওতালিতে স্নাতক হন। ২০১২ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৩ সালে নেট কোয়ালিফাই করার পর তিনি গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। ২০২৫ সালে বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাঁওতালি সাহিত্যে উপন্যাসের রূপ ও গঠন শিক্ষক গবেষণা পত্রের জন্য তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

    বিদ্যালয় শিক্ষা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হলেও খুব দ্রুত উচ্চ শিক্ষার আঙিনায় প্রবেশ করেন তিনি। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে বাংলার তৎকালীন রাজ্যপাল ড. সিভি আনন্দ বোস তাঁকে রাজভবনে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছিলেন। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি অলচিকি লিপির শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক নতুন দিল্লি সিসিআরটিতে লিপির বিশ্বায়নে ভূমিকার জন্য তাঁকে বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয়। তিনি শুধু ভাষাবিদ নন। কবি, গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। ২০১৭ সালে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৬৫ টি কবিতার সাঁওতালি অনুবাদ সম্পাদনা করেছিলেন। চলতি বছরের ৭ মার্চ শিলিগুড়িতে আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে সাধু শ্যাম মুর্মু পুরস্কার প্রদান করেন। এছাড়া আরও বহু পুরস্কার তিনি পেয়েছেন।

    ওসতানা উৎসবের মূল বিষয় ছিল, স্বাধীনতা প্রান্তিক সীমানায় বাস করে। জুরি কমিটি জানিয়েছে, অধ্যাপক কেবল প্রাচীন ঐতিহ্যের বৃত্তে আটকে থাকেননি। তিনি একদিকে যেমন সাঁওতালি ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। তেমনই নিজের শিক্ষামূলক ইউটিউব চ্যানেল, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক ভিজুয়াল গ্রাফিক্সের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে লিপিকে সচল, আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। যা ওসতানা কমিটির মূল ভাবনার সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছে।
  • Link to this news (প্রতিদিন)