এই সময়: জুন শেষ হতে চলল, কিন্তু কমলো না কলকাতার উপরে বজ্রপাতের বহর। ২৩ ও ২৫ জুন ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দু’দিন ৬০০–র বেশি বাজ পড়েছিল কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে। সোমবার, ২৯ জুন দক্ষিণ কলকাতা এক ঘণ্টায় ২০০–র বেশি বজ্রপাতের সাক্ষী থাকল। সোমবার বজ্রগর্ভ কিউমুলোনিম্বাস মেঘের স্তম্ভটি প্রধানত দক্ষিণ কলকাতার উপরেই তৈরি হওয়ায় বজ্রপাত মূলত সীমাবদ্ধ ছিল শহরের ওই প্রান্তেই। আবহবিদদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভূপৃষ্ঠের ৭০০ মিটার উপর থেকে দেড় কিলোমিটারের উপর পর্যন্ত এ দিন যে ভাবে ‘ক্লাউড টু সারফেস’ বাজ তৈরি হচ্ছিল, তার নজির খুব বেশি নেই। একটা সময়ে কসবা ও যাদবপুরের উপরে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মিনিটে ছয় থেকে সাতটি করে বাজ পড়ছিল।
শুক্র থেকে রবিবার পর্যন্ত কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা তেমন ভাবে বৃষ্টি পায়নি। অন্য দিকে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা বিক্ষিপ্ত ভাবে বৃষ্টি পেলেও দিনের তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করেছে ৩৬–৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। রাতের তাপমাত্রাও ২৬–২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে নামেনি। এমন উষ্ণ আবহাওয়ার সঙ্গে বাতাসে উপস্থিত বিপুল পরিমাণে জলীয় বাষ্প কিউমুলোনিম্বাস মেঘের স্তম্ভ তৈরির আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছিল। অতি দ্রুত তৈরি হওয়া ওই মেঘের স্তম্ভের সান্নিধ্য পেয়ে বাতাসে ভাসমান কণা প্রবল বজ্রপাতের পরিস্থিতিতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। ওই কণাকে কেন্দ্র করেই জলীয় বাষ্প জমছিল।
কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে পুনের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজি (আইআইটিএম) জানাচ্ছে, সোমবার কলকাতার দক্ষিণাংশে যে অতি তীব্র বজ্রপাত হয়েছিল, তার মূল কারণ হলো বায়ুমণ্ডলের চরম অস্থিরতা। একদিকে উষ্ণ ও জলীয় বাষ্পে সমৃদ্ধ বায়ু শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ (আপড্রাফট) হিসেবে দ্রুত উপরে উঠে প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে বরফে পরিণত হচ্ছিল। অন্য দিকে সেই বরফের কণা ও জলকণার মধ্যে ঘন ঘন সংঘর্ষে বিপুল বৈদ্যুতিক চার্জের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছিল। এই চার্জ হঠাৎ নির্গত হয়ে বিপুল শক্তির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আকাশে উজ্জ্বল বিদ্যুতের ঝলকানি এবং প্রচণ্ড বজ্রধ্বনি সৃষ্টি করেছিল।
আইআইটিএম জানিয়েছে, এ দিন কলকাতার আকাশে একই সঙ্গে মেঘ ও মাটির মধ্যে এবং দু’টি মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জের বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে মাটি থেকে খুব অল্প উচ্চতায় এই ঘটনা ঘটতে থাকায় বজ্রপাতের তীব্রতা এত বেশি ছিল। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা জানাচ্ছেন, বাজের মধ্যে বিপুল পরিমাণ শক্তি থাকে। একটি মাত্র বজ্রপাত আশপাশের বাতাসকে প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত করতে পারে — যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় পাঁচ গুণ।
সোমবার যে কিউমুলোনিম্বাস মেঘের স্তম্ভ তৈরি হয়েছিল, তার উচ্চতা ১২ থেকে ১৪ কিমি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। এ দিন আলিপুরে ২৬.৬ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড হলেও যোধপুর পার্ক ও গড়িয়া কামডহরিতে যথাক্রমে ৯১ মিমি ৮১ মিমি বৃষ্টি হয়।