• ভালো ব্যাকটেরিয়ায় মিলতে পারে অবসাদ কাটানোর দিশা, গবেষণা কলকাতার দুই চিকিৎসক-বিজ্ঞানীর
    এই সময় | ৩০ জুন ২০২৬
  • এই সময়: অন্ত্রের ‘ভালো ব্যাকটেরিয়া’ কি অবসাদ কাটাতেও সাহায্য করতে পারে? কলকাতার দুই চিকিৎসক-বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে হওয়া ‘প্রডিজ়ি’ নামের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সেই সম্ভাবনাকেই সামনে আনল। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, উদ্বেগ, অবসাদের শিকার প্রবীণদের ক্ষেত্রে প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্টের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু প্রোবায়োটিক ব্যবহার করলে অবসাদ ও উদ্বেগের উপসর্গ আরও ভালো কমতে পারে। কম খরচে সহজলভ্য এই সহায়ক চিকিৎসাপদ্ধতি ভবিষ্যতে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

    গবেষণার মূল ভাবনা ও ট্রায়ালের প্রাথমিক নীলনকশা তৈরি করেন আইসিএমআর নিরবি (পূর্বতন নাইসেড)-র সিনিয়র সায়েন্টিস্ট তথা ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শৈবাল দাস এবং টাটা মেডিক্যাল সেন্টারের মেডিক্যাল রিসার্চ কনসালট্যান্ট তথা নিউরোসায়েন্টিস্ট চিকিৎসক অভিনব ঘোষ। গবেষক দলে ছিলেন প্রীতি সিনহা, প্রসূন চট্টোপাধ্যায়, করিশমা সুন্দর রাজু, রসিকা পানওয়ার-সহ দিল্লি এইমস ও বেঙ্গুলুরু নিমহ্যান্সের বেশ কয়েক জন গবেষক। তাঁদের গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত ‘জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান জেরিয়াট্রিক সোসাইটি’ বিজ্ঞানপত্রিকায়। আগামী জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠেয় ‘ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অফ বেসিক অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজি’ সম্মেলনে গবেষণাপত্রটি উপস্থাপিত হওয়ার কথা।

    স্বাস্থ্য গবেষণা দপ্তরের (ডিএইচআর) অর্থানুকূল্যে দিল্লি এইমস এবং বেঙ্গালুরু নিমহ্যান্সে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়। গবেষণায় ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মাঝারি মাত্রার অবসাদে আক্রান্ত ৫৮ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের একাংশকে ১২ সপ্তাহ ধরে অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্টের পাশাপাশি ‘ল্যাক্টোব্যাসিলাস হেলভেটিকাস’ ও ‘বিফিডোব্যাকটেরিয়াম লঙ্গাম’-সমৃদ্ধ প্রোবায়োটিক দেওয়া হয়। আর বাকিদের দেওয়া হয় প্লাসিবো (ওষুধের মতোই দেখতে, কিন্তু ওষুধের গুণহীন)। ২৪ সপ্তাহের পর্যবেক্ষণে দু’টি গোষ্ঠীতেই উন্নতি দেখা গেলেও, প্রোবায়োটিক সেবনকারীদের ক্ষেত্রে অবসাদ ও উদ্বেগের উপসর্গ তুলনামূলক ভাবে বেশি কমেছে দেখা যায়। পাশাপাশি স্নায়ুকোষের বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের সুস্থ কার্যকলাপ ও স্নায়ুকোষের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া প্রোটিন বিডিএনএফ (ব্রেন ডিরাইভড নিউরোট্রপিক ফ্যাক্টর)-এর মাত্রাও বৃদ্ধি পায়।

    প্রকল্পের মুখ্য গবেষক শৈবালের বক্তব্য, ‘আমাদের এই গবেষণার ফলাফল একেবারেই নতুন এবং উৎসাহব্যঞ্জক। এই ইতিবাচক ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা এখন আরও বড় পরিসরে একটি ফলো-আপ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরিকল্পনা করছি। এর মাধ্যমে আরও বেশি সংখ্যক রোগীর মধ্যে এই ফলাফল কতটা কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য, তা যাচাই করা হবে।’ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সহ-মুখ্য গবেষক অভিনব বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য, স্বাস্থ্য পরিষেবার বিভিন্ন সমস্যার বিজ্ঞানভিত্তিক সাশ্রয়ী সমাধান উদ্ভাবন করা এবং তাকে জনসাধারণের সামর্থ্যের মধ্যে নিয়ে আসা। প্রডিজি় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উৎসাহব্যঞ্জক ফলাফল আমাদের সেই লক্ষ্যে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।’

    এই গবেষণাকে স্বাগত জানাচ্ছে চিকিৎসকদের বড় অংশ। জেরিয়াট্রিক নিউরো-সাইকিয়াট্রির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা, অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’ নামে একটি দ্বিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। অন্ত্রের উপকারী জীবাণু সেরোটোনিন-সহ বিভিন্ন স্নায়ু-রাসায়নিক পদার্থ প্রদাহ এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে ইতিবাচক ঢঙে। সেই কারণেই প্রোবায়োটিক মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে। এবং তা শুধু প্রবীণদের জন্যেই নয়, সব বয়সের জন্যেই। তবে এটি যে অবসাদের ওষুধের বিকল্প নয়, বরং প্রচলিত চিকিৎসার সহায়ক পদ্ধতি, সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এবং এই গবেষণা আরও বড় মাপে হওয়া উচিত বলে মনে করেন তাঁরা।

    গবেষণালব্ধ ফল আরও তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার কারণ— ‘ইন্ডিয়া এজিং রিপোর্ট ২০২৩’ অনুযায়ী, ২০৫০-এর মধ্যে ভারতে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা হবে প্রায় ৩৪.৭ কোটি। আবার বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, দেশের প্রায় ৩৫% প্রবীণ কোনও না কোনও মাত্রার অবসাদে ভোগেন। তাই প্রোবায়োটিক যে সেই সমস্যার সমাধানে সাশ্রয়ী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, তাতে সন্দেহ নেই।

  • Link to this news (এই সময়)