নিঝুম রাত। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে জেলা জুড়ে। ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে দশটা ছুঁইছুঁই। আচমকাই নৈঃশব্দ্য ভেঙে বেজে উঠল জরুরি সাইরেন। সাইরেন বাজিয়ে বার্তা দেওয়া হল, ঝাড়গ্রাম ও গিধনি স্টেশনের মাঝামাঝি জায়গায় লাইনচ্যুত হয়ে গিয়েছে একটি ট্রেন। আর সেই খবর পাওয়া মাত্রই রেলের অন্দরে শুরু হয়ে গেল চরম তৎপরতা। নিমেষের মধ্যে ঘুম ছুটে গেল কর্তাদের। তবে ঘণ্টাখানেক পর স্বস্তি ফিরল সবার মনে। জানা গেল, সত্যিই কোনও বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটেনি। রেলকর্মীদের আপৎকালীন প্রস্তুতি এবং বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষমতা খতিয়ে দেখতে এটি ছিল খড়গপুর রেলওয়ে ডিভিশনের একটি পূর্বপরিকল্পিত মহড়া বা ‘মক ড্রিল’।
তবে এই মহড়াকে কেন্দ্র করে প্রাথমিকভাবে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। তিন বছর পর সেই জুন মাস, করমন্ডল ট্রেন দুর্ঘটনার তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর রাত্রিতে এমন সাইরেন বাজার ঘটনায় রীতিমত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, গভীর রাতে বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আচমকা কোনও রেল দুর্ঘটনা ঘটলে রেলের বিভিন্ন দফতর ঠিক কতটা প্রস্তুত থাকে, তা সরেজমিনে যাচাই করা এই মহড়ার মূল লক্ষ্য ছিল। একইসঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা নিজেদের মধ্যে কতটা দ্রুত ও নিখুঁত সমন্বয় সাধন করে উদ্ধারকাজ চালাতে পারেন, সেটাও দেখার বিষয় ছিল। সেই উদ্দেশ্যেই নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য মেনে ঘড়িতে যখন ঠিক রাত ১০টা ২৮ মিনিট।
তখন প্রথম হুটার বাজিয়ে কৃত্রিম এই দুর্ঘটনার খবর সম্প্রচার করা হয়। খবর পাওয়া মাত্রই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করে দেয় রেল প্রশাসন। মাত্র তিন মিনিটের মাথায়, অর্থাৎ রাত ১০টা ৩১ মিনিটে উদ্ধারকাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি মেডিক্যাল ভ্যান বা অ্যাক্সিডেন্ট রিলিফ মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট (এআরএমই) প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ঠিক দু’মিনিট পর, রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে নির্দেশ যায় দুর্ঘটনা মোকাবিলায় ব্যবহৃত বিশেষ ট্রেন বা অ্যাক্সিডেন্ট রিলিফ ট্রেন (এআরটি)-এর কাছে। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই চরম পেশাদারিত্বের সঙ্গে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কাজ শুরু করে দেন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিভাগের কর্মীরা।
সবরকম প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরে রাত ১১টা ১০ মিনিটে ‘দুর্ঘটনাস্থল’-এর উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এআরএমই এবং এআরটি। রেল কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে গোটা প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়। এরপরই রাত ১১টা ২০ মিনিটে খড়গপুর এর ডিআরএম বা ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, অভিযানটি সফল এবং এটি পুরোটাই ছিল একটি মক ড্রিল। এই মহড়ার মাধ্যমে রেলের সমস্ত বিভাগের কর্মীদের সতর্কতা, দ্রুততা এবং সামগ্রিক প্রস্তুতি অত্যন্ত সফলভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে বলে খড়গপুর ডিভিশনের তরফে জানানো হয়েছে। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে যাত্রী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে রেলের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।