• কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালে এ কী কাণ্ড!
    আজকাল | ০১ জুলাই ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক:  শহর কলকাতা সহ রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর ভরসা রেখে মানুষ যখন নিশ্চিন্তে স্বস্তি বিশ্বাস ও ভরসার নিঃশ্বাস ফেলছে, ঠিক সেই সময় শহরের বেসরকারি চিকিৎসা সংস্থার অরাজকতা ও অবিশ্বাসের আর্তনাদ শহরকে কাপিয়ে তুলছে। অভিযোগ শ্লীলতাহানি ও নির্মম অত্যাচারের। শহর কলকাতার এক স্বনামধন্য বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে এবার শ্লীলতাহানি ও মারধরের অভিযোগ উঠল রোগীর পক্ষ থেকে। ঘটনার তদন্তে এবার পুলিশ। ঘটনা নিয়ে যথেষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। 

    দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের বাসিন্দা শহর কলকাতার এই স্বনামধন্য হাসপাতালের চিকিৎসাধীন ছিলেন অভিযোগকারীনির মা ও বাবা। এই বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে এফআইআর দায়েরের  করেছেন অভিযোগকারীনি। তিনি নিজে একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে প্রতিবাদ করায় তাঁকে জোর করে আটকে রাখা, মারধর, শ্লীলতাহানির চেষ্টা, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, ভিডিও মুছে ফেলার চাপ সৃষ্টি এবং প্রাণনাশের চেষ্টার মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে। 

    অভিযোগপত্র অনুযায়ী, অভিযোগকারীনির বাবা ২ জুন ২০২৬ তারিখে  হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৬ জুন তাঁর জরুরি অস্ত্রোপচার হয়। এরপর ৭ জুন তাঁর মাকেও হাসপাতালের অঙ্কলজি বিভাগের আইটিইউ-তে ভর্তি করা হয়। কিন্তু ওই রাত থেকেই এসি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। পরদিন মায়ের অস্ত্রোপচারের আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ট্রান্সফরমারের সমস্যার কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থার দাবি জানালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দেয় বলে অভিযোগ। 

    এদিকে, বাবার ছুটির সময় সার্ভিস চার্জ ও বেড চার্জ নিয়ে হাসপাতালের বিলিং বিভাগের সঙ্গে তীব্র বচসা হয়। অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৫ হাজার টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হয় বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীনি। 

     অভিযোগকারীনির দাবি, ৯ জুন মায়ের অস্ত্রোপচারের সময় তিনি দেখতে পান হাসপাতালের একাধিক অংশ অন্ধকারে ডুবে রয়েছে, লিফট বন্ধ, ফ্যান, এসি ও আলো—কোনোটিই কাজ করছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, CESC-এর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

     সেই পরিস্থিতি মোবাইলে ভিডিও করতে গেলে তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। এরপর তিনি ওপিডি এবং হাসপাতালের প্রশাসনিক তলায় গিয়ে দেখেন, যেখানে ঊর্ধ্বতন কর্তারা বসেন সেখানে লাইট, এসি-সহ সমস্ত পরিষেবা স্বাভাবিকভাবে চালু রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মেডিক্যাল সুপারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কোনও সহযোগিতা তিনি পাননি বলে অভিযোগ। অভিযোগ আরও গুরুতর হয় এরপর। 

    অভিযোগকারীনির দাবি, নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে ধাক্কাধাক্কি করে, তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং জোর করে কোন পানীয় তাকে খাইয়ে দুর্বল করে হুইলচেয়ারে করে পাঁচ তলার একটি ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা তাঁকে বেল্ট ও চাদর দিয়ে বিছানার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে চিকিৎসার চেষ্টা করা হয় এবং ভুল ওষুধ দেওয়ারও চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ। তিনি আরও দাবি করেছেন, ৭-৮ জন পুরুষ কর্মী তাঁকে মারধর করেন, শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন এবং গলা টিপে হত্যারও চেষ্টা পর্যন্ত করা হয় বলে অভিযোগ। 

     আরও অভিযোগ, তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। বরং তাঁর দিদিকে ফোন করে জানানো হয়, তাঁকে বেঁধে রাখা হয়েছে। ভিডিও কলেও তাঁকে দেখাতে অস্বীকার করা হয়। পরে হাসপাতালের পরিচিত এক ব্যক্তির কাছ থেকে বিভ্রান্ত করে একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয় অভিযোগকারিনীর চিকিৎসা করানোর নামে, বলেও অভিযোগ। যাকে দিয়ে স্বাক্ষর করানো হয় সেই ব্যক্তি তার পরিবারের কোনো সদস্যই নয় বলেই জানিয়েছেন তিনি। 

    সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ, হাসপাতালের এক প্রশাসনিক আধিকারিক তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও মুছে ফেলার চেষ্টা করেন। পরে আত্মীয়দেরও বলা হয়, ভিডিওগুলি ডিলিট না করলে হাসপাতালের সুনাম নষ্ট হবে।

    ঘটনার পর অভিযোগকারীনি প্রথমে নিউ আলিপুর থানায় এবং পরে বারুইপুর থানায় অভিযোগ জানান। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে বারুইপুর থানায় জিডিই নম্বর ১৩৫৬ (তারিখ: ১৪ জুন ২০২৬) নথিভুক্ত হয়েছে। ঘটনার জেরে শরীরে আঘাত লাগায় তিনি বারুইপুর হাসপাতালে চিকিৎসাও করান।  

    অভিযোগকারীনি আমাদের সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, "আমি একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। বিগত ১০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। এখন বয়স আমার ৩৪ বছর। আমার কোন মানসিক রোগ বা কোন কিছুই নেই। সাময়িক ডিপ্রেশনের কারণে চিকিৎসা করিয়েছিলাম ওষুধ খেয়েছিলাম গত বছর ২০২৫ সালে। এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। আর আমি সুস্থ না হলে শিক্ষকতা করতে পারতাম না এত বছর ধরে। মায়ের চিকিৎসা চলার কারণে হাসপাতালে যেতে হচ্ছিল। সেই সময় দু তিন দিন ধরেই হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বা এসি না কাজ করা ও অন্ধকার থাকার জন্য আমি প্রতিবাদ করি, পরবর্তীতে ভিডিও করি। আর তারপরেই আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করে। আমি বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ছি এই কথা বলে, আমাকে হঠাৎ একটি পানীয় খেতে দেয়, যা খেয়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার চারিদিক যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। এরপর আমাকে পরিবারের অনুমতি ছাড়াই হুইল চেয়ারে করে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালের এক কেবিনের ভেতরে চিকিৎসা করা শুরু করে। হাতে চ্যানেল করে স্যালাইন দেওয়া ও অপারেশনের পরিকল্পনা করছিল। যা আমি একেবারেই সম্মতি দেই নি। আমি তৎক্ষণাৎ আমার হাতের চ্যানেল খুলে ফেলি। শুনতে পাই যে এই ইনজেকশনটা আমাকে দিলে আমি নাকি কাবু হয়ে যাব। তাতে কাজ করতে সুবিধা হবে। আর তারপরেই আমি আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ি ভয় পেয়ে গিয়ে। তখন আমাকে সাত আট জন মিলে হাতে বেল্ট দিয়ে বেঁধে দেয়। আমার সাথে যা করছিল সেটা সম্পূর্ণই বেআইনি ও বলপূর্বক করছিল। ভিডিও কল করে আমার পরিবার আমাকে দেখতে চাইলেও সেখানে বাধা দেওয়া হয়। তারপরে আমার দিদি হাসপাতালে ছুটে এলে আমি এক প্রকার রক্ষা পাই। এখন পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছি, আশা করি পুলিশ এর সঠিক তদন্ত করবে। অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের সঠিক বিচার ও সাজা দেবে ব্যবস্থা করবে।"

     অভিযোগকারীনি সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ঘটনার ভিত্তিতে এফআইআর দায়েরের আবেদন জানিয়েছেন।  অন্যদিকে বেসরকারি স্বনামধন্য হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে জানিয়েছেন, এই মহিলার সঙ্গে আদতে হাসপাতালে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি। আর সবচেয়ে বড় বিষয়, এই মহিলা নিউরোসাইকো মেডিসিন খান। ওষুধের ডোজ কম পড়ার কারণে তার মধ্যে একটা উত্তেজনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল সাময়িকভাবে। নিজের হাতের স্যালাইন দেওয়ার চ্যানেল নিয়ে বলপূর্বক টানাটানি করতে থাকে নিজেই। আর তার কারণে হাতের মধ্যে একাধিক আঘাতে চিহ্ন দেখা গেছে। হাসপাতালে কেউ তাকে কোনরকম ভাবে আঘাত করেনি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখলে তা আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে বলেই জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

    উল্লেখযোগ্য বিষয়, অভিযোগকারীনি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাননি বলেই জানিয়েছেন তিনি। সেখানে তাকে বলপূর্বক চিকিৎসা করাতে যাওয়া তার পরিবারের সদস্যদের অনুমতি ছাড়াই, তা কি করে সম্ভব! কেনই বা অভিযোগকারীনিকে পানীয় খাওয়ানোর পর অসুস্থ হয়ে পড়েন? একদিকে যেমন হাসপাতালের একাংশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। পাশাপাশি প্রতিবাদ করাতে তাকে মানসিক রোগী প্রতিপন্ন করে বলপূর্বক চিকিৎসা করানোর প্রচেষ্টা। এই একাধিক প্রশ্নের উত্তর যদিও স্পষ্ট জানাতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যদিও এই বিষয় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে অভিযোগের ভিত্তিতে।

    পুলিশ সূত্রে খবর, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সম্পূর্ণ হলে আরও বিষয়টা স্পষ্ট হবে বলেই জানিয়েছে পুলিশ।
  • Link to this news (আজকাল)