তাঁর হাত কাঁচের গ্লাসে স্পর্শ লাগলে সেই জল পান করেন না অধ্যক্ষা। কলেজের কাজে অধ্যক্ষার কাছাকাছি যেতে হলে তিনি তাকে বেশ দূরে দূরে থাকতে বলেন। এমনকী অধ্যক্ষার রুমে থাকা হাজিরা খাতায় সই করতে গেলেও তাঁর চেম্বারে পর্যন্ত ঢুকতে নিষেধ করেন। পুরুলিয়ার বলরামপুর কলেজের একমাত্র স্থায়ী অশিক্ষক কর্মী বিশ্বনাথ রুহিদাস ‘অন্তজ’ শ্রেণির হওয়ায় এমনই ছোঁয়াছুঁয়ি বাতিক অধ্যক্ষার! তাই ওই অশিক্ষক কর্মীকে অধ্যক্ষার অনুপস্থিতিতে তাঁর চেম্বারে গিয়ে হাজিরা সই করে আসতে হয়। অধ্যক্ষা কখন টিফিনে গিয়েছেন বা কাজে গিয়েছেন অন্য রুমে, তা দেখে বুঝেশুনে নিজের হাজিরা স্বাক্ষর করতে হয়। না হলেই যে কোন না কোন কথা বলে খোঁটা দেবেন তিনি।
এই ঘটনা এক, দু’বছর নয়। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে। তবে গত দেড় বছর বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়েছে। তাই ওই অশিক্ষক কর্মী কলেজের টিচার কাউন্সিল, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, এক সময় কলেজের প্রশাসক, ডিপিআইয়ের কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু কোনও ফল পাননি। সম্প্রতি তিনি ন্যাশনাল কমিশন ফর সিডিউল কাস্টের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগ করেন বলরামপুর থানাতেও।
এ বিষয়ে জাতীয় কমিশন জেলাশাসক, পুলিশ সুপার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসচিবের কাছে অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট তলব করেছে। ওই স্থায়ী অশিক্ষক কর্মী বিশ্বনাথ রুহিদাস বলেন, “আমরা জাতিতে মুচি। শংসাপত্রে এটাই লেখা রয়েছে। সেই কারণেই কলেজের অধ্যক্ষা আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করেন। ‘ছোট জাত’ বলে খোঁটা দেন। ওনার চেম্বারে আমার ঢোকা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আসলে তার মধ্যে ছুৎমার্গ-বাতিক রয়েছে। তাঁর ফ্ল্যাটে পুজো করবেন বলে কলেজে ফুল গাছ লাগানো হয়েছে। সেই ফুল তিনি নিজে প্রতিদিন তুলে নিয়ে যান। একজন কলেজের অধ্যক্ষা হয়ে আমার মতো সাধারণ অশিক্ষক কর্মীর সঙ্গে উনি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে যা ব্যবহার করে যাচ্ছেন তাতে আমি ভেঙে পড়েছি। “
২০২৭ সালের ৩১ শে মার্চ তিনি অবসর নেবেন। তার আগে গত ১০ বছরের বেশি সময়ের অপমান, লাঞ্ছনার বিচার পেতে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেই নয়। একেবারে কমিশন এবং থানাতেও অভিযোগ দায়ের করেন ওই অশিক্ষক কর্মী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন জাতপাত গ্রাস করায় হতবাক হয়ে গিয়েছে পুলিশ। সম্প্রতি বলরামপুর থানার পুলিশের কাছে করা অভিযোগে তিনি লিখেছেন, ‘এই ঘটনায় মানসিকভাবে তিনি এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে যান। কিন্তু সন্তানের কথা ভেবে পিছু হঠেন। এই ঘটনায় কলেজের ওই অধ্যক্ষার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে বলরামপুর থানার পুলিশ।
এই বিষয়ে অধ্যক্ষা অনন্যা ঘোষের প্রতিক্রিয়া নিতে মঙ্গলবার বিকালে তাঁকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি সেই ফোন কেটে দেন। ওই অশিক্ষক কর্মীর কথায়, “২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে অধ্যক্ষার গাড়ির চালক অফিস রুমে বসে ডেস্কটপ থেকে নানান তথ্য নিচ্ছিলেন। আমি তার প্রতিবাদ করায় আমাকে ওই অধ্যক্ষার পায়ে পড়ে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে হয়েছে।” তার অভিযোগ, কথায় কথায় কলেজের অধ্যক্ষা তাকে হুমকি দিয়ে বলেন, “কেমন ভাবে অবসরকালীন সুবিধা মিলবে তা তিনি দেখে নেবেন।”