ন্যাপথার ‘কুয়াশা’ আগুনের রূপ নিয়ে বিভীষিকা! ছারখার ঘরবাড়ি, গাছপালা
বর্তমান | ০১ জুলাই ২০২৬
শ্যামল সেন, হলদিয়া: সোমবার বিকেল থেকেই কুয়াশার মতো আস্তরণ ছড়িয়ে ছিল এলাকায়। মঙ্গলবার ভোর রাতে সেই ‘কুয়াশা’ই ভয়ঙ্কর আগুনের রূপ নিয়ে ছারখার করে দিল গোটা এলাকা। লেলিহান শিখা গিলল মানুষ, ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, পাখি, গাছপালা। রেহাই পায়নি কেউই। জঙ্গলের শিয়ালও পালানোর আগেই ছটফট করে মারা গিয়েছে। সেই বিভীষিকার কথা বলতে গিয়ে গলা জড়িয়ে আসছিল মোহন দোলই, শুভাশিস ভুঁইয়া, গৌতম বেতালদের। সামান্য অগ্নিদগ্ধ হলেও বরাতজোরে প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন তাঁরা। মোহন নিজে বেঁচে গেলেও মা’কে নিয়ে এখন কলকাতায় এসএসকেএম হাসপাতালে। মোহন পেট্রকেমের প্রজেক্ট জবের শ্রমিক। ফোনে তিনি বলছিলেন, ‘যে পাইপ লাইনে আগুন লেগেছে সেটি আমাদের বাড়ির কাছেই। সন্ধ্যা বেলায় ডিউটিতে থাকার সময় ন্যাপথার গন্ধ পাই। ওইসময় বৃষ্টি হওয়ার কারণে গন্ধ আরও ভারী ছিল। পাড়ার লোকজন হলদিয়া ও ভবানীপুর থানায় ফোন করে বিষয়টি জানাই। রাত বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে পাইপ লাইনের পাশের খালে ও বাতাসে ন্যাপথা ভেপার জমতে থাকে। ভয়ে সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। আমার মতো অনেকেই জেগে ছিলেন। না হলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ত।’
ন্যাপথার ওই পাইপ লাইনটি পেট্রকেমের সাউথ গেটের পাশ দিয়ে প্ল্যান্ট এলাকায় ঢুকেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সাউথ গেটের দু’পাশেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। পাশেই একটি ক্যানাল ও দক্ষিণপূর্ব রেলের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের লাইন রয়েছে। পেট্রকেমের বিশাল গোডাউন রয়েছে। আগুনের গ্রাসে চলে যায় পুরো এলাকাটি। নাইট সিফ্টের কর্মীরা বলেন, হঠাৎ একটি আগুনের গোলা সাউথ গেটের ডান দিক থেকে বাম দিকে ছুটে যায়। যেন এক খণ্ড মেঘে আগুন লেগেছে! পুলিশ যাকে বলছে ‘ন্যাপথা ক্লাউড’। কী কারণে ন্যাপথায় আগুন লেগেছে তা তদন্ত সাপেক্ষ।
শিল্পপ্রবেশ স্টেশনের পাশে প্রথম আগুন লাগে। সেখানকার কয়েকটি বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। সেই বাড়ির বাসিন্দা মানু বিবি মারা গিয়েছেন কলকাতার হাসপাতালে। বেঁচে গেলেও শুভাশিস ও গৌতমের দু›টি পা ঝলসে গিয়েছে। গৌতম পেট্রকেমের ক্যান্টিন কর্মী। ডিউটিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘কিছু বুঝে ওঠার আগেই মনে হল আগুনের হলকায় পুড়ে গেল দুটো পা।’ একই অবস্থা আইওসির শ্রমিক শুভাশিসেরও। সবচেয়ে কষ্টদায়ক ঘটনা ঘটেছে বেলা বিবির পরিবারে। হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালের বেডে আট মাসের রূপসা খাতুনকে নিয়ে বসে আছেন। মা ও মেয়ে দু’জনেই অগ্নিদগ্ধ। স্বামী ও সাত বছরের অন্য একটি মেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় এসএসকেএমে ভর্তি। বিধায়ক প্রদীপ বিজলি বলেন, ‘অগ্নিদগ্ধদের দেখভালের জন্য একটি টিম তৈরি করেছি। তারা সারাক্ষণ নজরদারি করছে। চিরঞ্জীবপুর এলাকায় দুপুরে ত্রাণ শিবিরে কয়েকশো মানুষকে খাওয়ানো হয়েছে।’