এই সময়: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য গত ক’দিনে বারবার বলেছেন, ‘ডিম–থেরাপি’র প্রবণতা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। তারপরেও রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ— বিভিন্ন প্রান্তে কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তৃণমূল নেতাদের ডিম, কোথাও গোবর ছোড়ার ঘটনা ঘটছে। এ বার এই ধরনের প্রবণতা বন্ধে পুলিশ কঠোর নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের বেঞ্চের নির্দেশ— ‘ডিম ছুড়ে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের হেনস্থার ঘটনায় রাজ্যকে সরাসরি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে হবে।’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘এটা শুধু আইন করে বন্ধ করা যাবে না, তার জন্য নাগরিকদের সচেতন ও সতর্ক করতে হবে।’
কী ভাবে এই সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করা দরকার?
ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য, ‘জনগণ নিজেদের হাতে আইন তুলে নিতে পারে না। রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্ব হলো, সবাইকে নিরাপত্তা দেওয়া। এই ব্যাপারে একটা গাইডলাইন তৈরি করে রাজ্যকে তার প্রচার করতে হবে। ডিম ছুড়লে কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, তারও প্রচার করতে হবে রাজ্যকে।’ গোটা রাজ্যে চলতে থাকা এই প্রবণতা বন্ধে এখনও পর্যন্ত পুলিশ কী পদক্ষেপ করেছে, কতগুলি মামলা দায়ের করা হয়েছে, তা নিয়ে রাজ্যের হলফনামাও তলব করেছে হাইকোর্ট। আগামী ২০ জুলাই হলফনামা দিয়ে এই ব্যাপারে রাজ্যকে জানাতে হবে, ডিম ছোড়ার ঘটনায় কত মামলা দায়ের হয়েছে এবং কাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তৃণমূল নেতা–নেত্রীদের উপরে হামলা ও ডিম ছোড়ার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয় হাইকোর্টে। এই ধরনের ঘটনা বন্ধ করতে সমস্ত থানার জন্য রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে নির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করতে হবে বলেও মন্তব্য করে ডিভিশন বেঞ্চ।
যে ভাবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটে চলেছে, তা নিয়ে ক’দিন আগে শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘কোনও মানুষকে দেখে পচা ডিম ছুড়ে দেওয়া কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হতে পারে না। কিন্তু ছোড়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হবে।’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও একই সুরে বলেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষের স্বার্থে অনেক প্রতিশ্রুতি আছে (রাজ্য) বাজেটে। তৃণমূলকে এর থেকে ভালো জবাব আর কী হতে পারে! অযথা ডিম ছুড়ছেন কেন! মানুষ এটা পছন্দ করছে না।’ কিন্তু তাঁদের বারংবার বার্তার পরেও নিচুতলায় অনেক ক্ষেত্রে এই প্রবণতা রুখতে কার্যকরী পদক্ষেপ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। এ দিনও হাওড়া স্টেশন চত্বরে হাওড়া সদর আইএনটিটিইউসি-র প্রাক্তন সভাপতি অরবিন্দ দাসকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে। হুগলির তারকেশ্বরের তালপুর এলাকায় তৃণমূলের এক নেতাকে জুতোর মালা পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানো, ডিম ছোড়া এবং মারধরের অভিযোগও সামনে এসেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগের তির বিজেপির স্থানীয় কর্মী–সমর্থকদের একাংশের বিরুদ্ধে। যদিও বিজেপি নেতৃত্বের ব্যাখ্যা, এ সবই জনরোষের ফল।
এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এ দিন রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদারের যুক্তি, ‘রাজ্য কোনও ভাবেই এগুলো সমর্থন করে না। যেখানে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো হচ্ছে, সেখানে পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। এফআইআর দায়ের করে তদন্ত হচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। দু’সপ্তাহ সময় দেওয়া হোক। পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা জানাবে রাজ্য।’ ডিভিশন বেঞ্চের পাল্টা বক্তব্য, ‘সরকার যদি সমর্থন না করে, তা হলে ব্যাপারটা নিয়ে আরও সিরিয়াস হওয়া দরকার। রাজ্যজুড়ে এখন এই ডিম ছোড়া চলছে। সেখানে দু’–একটা এফআইআর করে কী হবে? এটাকে সামগ্রিক ভাবে দেখা দরকার। শুধু আইনি পদক্ষেপ করা নয়, সাধারণ মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করার দরকার আছে।’ আদালতের আরও বক্তব্য, ‘প্রত্যেকের মানবাধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। এর অন্যথা করা যায় না।’ মামলাকারীর তরফে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘ডিম ছোড়ায় পুলিশও অনেক ক্ষেত্রে মদত দিচ্ছে। অবিলম্বে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হোক। না হলে পুলিশ পদক্ষেপ করবে না।’ তাঁর অভিযোগ, ‘এমনও ঘটনা ঘটেছে, যেখানে রাজ্যের মন্ত্রী ডিম ছুড়তে উস্কানি দিচ্ছেন। আমরা ভিডিয়ো ও ছবি দিয়ে দিয়ে প্রমাণ দেবো।’ আদালত অবশ্য অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে অস্বীকার করে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূল কর্মীদের উপরে হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স হ্যান্ডলে দীর্ঘ পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন আজ বিজেপির রাজনীতির শিকার। বিজেপি কর্মীরা তৃণমূল কর্মীদের উপরে হামলা করছে, কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরাচ্ছে এবং পাথর ছুড়ে মারাত্মক ভাবে আহত করছে। প্রতিদিন তারা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা এবং মৌলিক মানবাধিকার প্রকাশ্যেই লঙ্ঘিত হচ্ছে।’