এই সময়: বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্ত থেকে শুরু করে বাংলার উপকূলবর্তী এলাকার উপর দিয়ে একেবারে কাশ্মীর পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ পথ জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে একটি মৌসুমি অক্ষরেখা। কৃত্রিম উপগ্রহ ইনস্যাট–থ্রিডি–এস–এর ক্যামেরায় এই দৃশ্য ধরা পড়ার পরে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন আবহবিদরা। মৌসম ভবন জানাচ্ছে, এই অক্ষরেখা ধীরে ধীরে দক্ষিণে স্বাভাবিক অবস্থানে সরে এলে উত্তর ভারতে বজ্রপাত–সহ ঝড় ও বৃষ্টি উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়বে এবং গতিহারা দক্ষিণ–পশ্চিম মৌসুমি বায়ুও দ্রুত অগ্রসর হবে। একই সঙ্গে গাঙ্গেয় বঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের যে বিরাট এলাকা এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত বৃষ্টি পায়নি, সেই এলাকাগুলোতেও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী এই সপ্তাহের শেষ দিকে বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। আলিপুর হাওয়া অফিস জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি ওই নিম্নচাপের প্রভাবে শুক্রবার থেকে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ভারী (৭–১১ সেমি) থেকে অতিভারী (৭–২০ সেমি বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে শনি থেকে সোম— এই তিন দিন বৃষ্টির প্রাবল্য সহচেয়ে বেশি হতে পারে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম এবং পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় বৃষ্টির প্রাবল্য সবচেয়ে বেশি থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
সোমবারও দিল্লি–সহ উত্তর ভারতে তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল। ওই দিন রাজধানীর সফদরজংয়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার করেছিল। দিল্লির রিজ এলাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পৌঁছয় ৪৩.৪ ডিগ্রিতে। হরিয়ানার রোহতকে ৪৩.৫ ডিগ্রি এবং রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরে তাপমাত্রা ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো বর্ষার বৃষ্টি। সেই সম্ভাবনাই প্রবল হয়েছে উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়া ছবির দৌলতে। আবহবিদদের মতে, আগামী কয়েক দিনে এই অক্ষরেখাই উত্তর ভারতে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের পথ প্রশস্ত করতে চলেছে। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (আইএমডি) জানিয়েছে, যে মৌসুমি অক্ষরেখাটি তৈরি হয়েছে, সেটি এখনও হিমালয়ের পাদদেশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। অপেক্ষা শুধু এই অক্ষরেখার ক্রমশ দক্ষিণে তার স্বাভাবিক অবস্থানে সরে আসার। আশা করা হচ্ছে, জুলাইয়ের ১ থেকে ৪ তারিখের মধ্যে উত্তর ভারতে মৌসুমি বাতাসের দাপট আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ঝড়–বৃষ্টির প্রবণতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়বে। দক্ষিণ–পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতে প্রবেশ করার পরে তিন সপ্তাহ পার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বর্ষার এই বাতাস হঠাৎই গতি হারানোর ফলে উত্তর ভারত–সহ দেশের বিরাট অংশে বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। দীর্ঘ বিস্তৃত মৌসুমি অক্ষরেখার প্রভাবে এ বার হয়তো বর্ষার বাতাস পুনরুজ্জীবিত হবে।
মনসুন ট্রাফ বা মৌসুমি অক্ষরেখা কী?
মৌসুমি অক্ষরেখা হলো দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমির মেরুদণ্ড। আবহবিদদের মতে, এটি বায়ুমণ্ডলের নিম্নচাপের ফলে তৈরি হওয়া এমন একটি দীর্ঘ অঞ্চল যা আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্পবাহী বাতাসকে ভারতের মূল ভূখণ্ডে টেনে আনে।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই অক্ষরেখাটি যখন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উত্তরে অবস্থান করে, তখন বৃষ্টিপাত মূলত হিমালয়ের পাদদেশেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান-সহ উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ সমতল অঞ্চল তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কবলে পড়ে। এ বছর এখনও তেমনটাই চলছে। হিমালয়–সংলগ্ন অঞ্চল ও উত্তর–পূর্ব ভারত প্রবল বৃষ্টি পেলেও মধ্য, পশ্চিম ও উত্তর ভারতের অবস্থা শোচনীয়। প্রচণ্ড গরমের পাশাপাশি বাতাসে উত্তর ভারতের বাতাসে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকায় হরিয়ানা, রাজস্থান এবং দিল্লি-এনসিআর–এর কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্ন ভাবে ঝড়বৃষ্টি হলেও আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি চরমে পৌঁছেছে।