• নাট্যজগতে শোকের ছায়া, প্রয়াত নির্দেশক-অভিনেত্রী বিজয়া মেহতা
    eTV Bharat | ০১ জুলাই ২০২৬
  • হায়দরাবাদ, 1 জুলাই: থিয়েটার জগতে নক্ষত্র পতন ! বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে মঙ্গলবার রাতে প্রয়াত হয়েছেন প্রবীণ নাট্য নির্দেশক ও অভিনেত্রী বিজয়া মেহতা (Vijaya Mehta)। তাঁর বয়স হয়েছিল 92 বছর। 'বাই' নামে পরিচিত বিজয়া মেহতা দক্ষিণ মুম্বইয়ের নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অভিনেতা বিজয় কেন্দ্রেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।

    মারাঠি নাট্যজগতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বিজয়া মেহতা ভারতের শ্রেষ্ঠ নাট্য নির্দেশকদের একজন হয়ে ওঠার আগে অভিনেত্রী হিসেবেও নিজের বিশেষ পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বহু প্রশংসিত নাটক পরিচালনা করেছেন এবং নাট্যশিল্পীদের একাধিক প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন। ষাটের দশকে মারাঠি নাট্যমঞ্চে বিজয়া মেহতা এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নাট্যকার বিজয় তেন্ডুলকর এবং অভিনেতা ড. শ্রীরাম লাগু, অরবিন্দ দেশপান্ডে ও অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে তিনি 'রঙ্গায়ন' নামে এক পরীক্ষামূলক নাট্যদল গড়ে তোলেন। মেহতা একসময় 'রঙ্গায়ন'-এর কার্যক্রমকে 'নিজেদের দর্শক তৈরি করার' এক প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

    পরীক্ষামূলক নাটক মঞ্চস্থ করার লক্ষ্যে প্রতিভাবান নাট্যকার ও অভিনেতাদের একত্রিত করার জন্য 'রঙ্গায়ন' পরিচিতি লাভ করেছিল। মেহতার বিশ্বাস ছিল যে, এই দলটি পেশাদারিত্ব, নাটকের প্রতি পূর্ণ নিষ্ঠা এবং বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে গুণমানকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতিতে পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে তিনি 'রঙ্গায়ন' থেকে সরে আসেন ৷ একজন স্বতন্ত্র (ফ্রিল্যান্স) নির্দেশক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সমসাময়িকরা তাঁর এই বিষয়টির প্রশংসা করতেন যে, তিনি কখনই লিঙ্গ-পরিচয়কে নিজের রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে তুলে ধরেননি ৷ তা সত্ত্বেও তাঁর কাজে সর্বদা একজন নারী নির্দেশকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হতো।

    মেহতার নির্দেশনায় মঞ্চস্থ জনপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে 'এক শূন্য বাজিরাও', 'ব্যারিস্টার', 'হামিদাবাইচি কোঠি', 'পুরুষ', 'মহাসাগর' এবং 'শকুন্তল'। এছাড়া তিনি 'রাও সাহেব' (1986) ও 'পেস্টনজি' (1988)-র মতো প্রশংসিত হিন্দি সিনেমা পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতেও নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন। অভিনেত্রী হিসেবে তিনি গোবিন্দ নিহলানির 1984 সালের 'পার্টি'-র জন্য এশিয়া প্যাসিফিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন।

    বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে মেহতা বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা অর্জন করেন, এর মধ্যে রয়েছে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি ঠাকুর রত্ন এবং শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মেহতার প্রয়াণে মারাঠি নাট্যজগৎ গভীর শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে ৷ সারা দেশ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও শোকবার্তা জানিয়েছে।

    মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ বলেছেন, "বিজয়া মেহতার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে পারফর্মিং আর্ট বা পরিবেশন শিল্পের জগতে একটি প্রজন্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।" অভিনেত্রী ভারতী আচরেকর ইনস্টাগ্রামে মেহতা ও নানা পাটেকরের সঙ্গে তোলা আগে কখনও দেখা যায়নি এমন সব ছবি শেয়ার করে তাঁর পরামর্শদাতাকে স্মরণ করলেন।

    অভিনেতা অনুপম খের-যিনি মেহতার পরিচালনায় 'রাও সাহেব' ও 'পেস্টনজি' সিনেমায় কাজ করেছিলেন-এক আবেগঘন শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন। তিনি লিখেছেন, "ততদিনে আমি কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করে ফেলেছিলাম এবং ভেবেছিলাম অভিনয় সম্পর্কে কিছুটা বুঝি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে প্রতিটি মহড়া আমাকে মনে করিয়ে দিত যে, অভিনয়ের এই শিল্প আসলে কত বিশাল এক মহাসাগর। তাঁর অগাধ প্রজ্ঞা, মানুষের আচরণ সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া এবং অসাধারণ সংবেদনশীলতার সামনে আমি সানন্দে আবারও একজন ছাত্র হয়ে উঠতাম। তিনি কখনোই নিজের জ্ঞান অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতেন না বরং তা দিয়ে আলোকিত করতেন। তিনি কখনোই গলার স্বর উঁচু করতেন না বরং আপনার কাজের মানকে উন্নত করতেন। তাঁর শৃঙ্খলার মধ্যে ছিল স্নিগ্ধতা, উষ্ণতার মধ্যে ছিল বিনয় এবং প্রতিভার মধ্যে ছিল সরলতা।"

    1934 সালের ৪4 নভেম্বর গুজরাটের ভাদোদরায় বিজয়া জয়বন্ত হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন বিজয়া মেহতা ৷ এরপর মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ইব্রাহিম আলকাজি ও আদি মারজবানের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তিনি প্রখ্যাত ইংরেজি ও গুজরাটি নাট্য-অভিনেতা ফারুক মেহতার স্ত্রী এবং প্রবীণ অভিনেত্রী দুর্গা খোতের পুত্রবধূ ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি এক কন্যা ও দুই পুত্র রেখে গিয়েছেন।
  • Link to this news (eTV Bharat)