• কাঁচ কাটেনি, বোতলও ভাঙেনি! কোন জাদুতে ভিতরে আস্ত জাহাজ ঢোকালেন আউশগ্রামের অঞ্জন? দেখুন
    News18 বাংলা | ০১ জুলাই ২০২৬
  • : মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া আর যান্ত্রিক জীবনের এই সময়ে হাতে তৈরি শিল্পকর্মের কদর যেন দিন দিন কমছে। কিন্তু সেই ধারণাকেই ভুল প্রমাণ করছেন পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রাম শিবদার যুবক অঞ্জন বিশ্বাস। সাধারণ একটি কাঁচের বোতলের ভিতরে নিখুঁতভাবে তৈরি করছেন আস্ত একটি জাহাজ। প্রথম দেখায় মনে হয় যেন জাদু! বোতল না ভেঙে কীভাবে এত বড় একটি জাহাজ তার ভিতরে ঢুকল? সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খায় মানুষের মনে। আর সেই বিস্ময়ের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে অসীম ধৈর্য, সূক্ষ্ম কারিগরি দক্ষতা এবং এক তরুণ শিল্পীর নিরলস পরিশ্রম।

    আউশগ্রামের শিবদা গ্রামের বাসিন্দা অঞ্জন বিশ্বাস পেশায় একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে চাকরির কাজে। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা তাঁর শিল্পচর্চাকে কোনওদিন থামাতে পারেনি। বরং অবসর সময় পেলেই তিনি ডুবে যান নতুন কিছু তৈরির নেশায়। ছোটবেলা থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর টান। কারণ, তাঁর বাবা একজন দক্ষ কাঠশিল্পী। বাবার হাতের কাজ দেখেই শিল্পের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। তবে বাবার পথ অনুসরণ করলেও তিনি চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কিছু সৃষ্টি করতে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় কাঁচের বোতলের ভিতরে জাহাজ তৈরির মতো অভিনব শিল্পচর্চা।

    অঞ্জন জানান, এই কাজ শেখার জন্য তিনি কোনও প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নেননি। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়, দীর্ঘদিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং অক্লান্ত অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি এই শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছেন। তাঁর কথায়, “বাবা কাঠের শিল্পী। ছোট থেকেই বাবাকে দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছি। তবে ইচ্ছা ছিল অন্যরকম কিছু করার। তাই নিজের চেষ্টাতেই এই ধরনের কাজ শিখেছি।” কাঁচের বোতলের ভেতরে জাহাজ তৈরি করাই নয়, অঞ্জনের শিল্প প্রতিভা আরও নানা মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কাঠ দিয়ে তৈরি নান্দনিক দেওয়াল ঘড়ি, বিভিন্ন শোপিস, এমনকি একটি গোটা ডিমের খোলের উপর সূক্ষ্ম নকশা ফুটিয়ে তোলার মতো কঠিন কাজও অনায়াসে করে ফেলেন তিনি। প্রতিটি শিল্পকর্মেই ফুটে ওঠে তাঁর নিখুঁত কারিগরি, ধৈর্য এবং সৃজনশীলতার ছাপ। একটি ছোট ভুলেই পুরো কাজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়।অঞ্জনের কথায়, “এই কাজ করতে গেলে প্রচুর ধৈর্য লাগে। অনেক সময় একটি কাজ শেষ করতে কয়েক দিন লেগে যায়। তবে মানুষ যখন আমার কাজ দেখে প্রশংসা করেন, তখন সব পরিশ্রম সার্থক বলে মনে হয়।”

    একসময় শুধুমাত্র নিজের শখের বশে শুরু হওয়া এই শিল্পচর্চাই আজ তাঁর পরিচয়ের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। স্থানীয় মানুষ তো বটেই, এখন অনলাইন মাধ্যমেও তাঁর শিল্পকর্মের যথেষ্ট চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উপহার হিসেবে কাঁচের বোতলের ভিতরে তৈরি জাহাজের শোপিস বেশ জনপ্রিয়। প্রতিটি জাহাজের মূল্য প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে। অভিনব এবং হাতে তৈরি উপহার খুঁজছেন এমন ক্রেতাদের কাছে এই শিল্পকর্ম বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।অঞ্জনের পরিবারে রয়েছেন তাঁর বাবা ও মা। দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে গ্রাম থেকেও বিশ্বমানের শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব। আউশগ্রামের মতো প্রত্যন্ত এলাকার এই তরুণ শিল্পীর সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং গোটা জেলার জন্য গর্বের বিষয়। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রতিভার বিকাশ কোনও শহর বা বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। সঠিক নিষ্ঠা, ধৈর্য এবং সৃজনশীলতা থাকলে গ্রামের মাটিতেও জন্ম নিতে পারে অনন্য শিল্পের বিস্ময়। অঞ্জন বিশ্বাসের তৈরি শিল্পকর্ম সম্পর্কে জানতে বা অর্ডার করতে চাইলে তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যেতে পারে এই নম্বরে: ৭৬৯৯২ ৫৮৪৭৭।
  • Link to this news (News18 বাংলা)