• যেন সরস্বতীর বরপুত্র, তালিম ছাড়াই এই শিল্পী ক্যানভাসকে করে তোলেন জীবন্ত
    News18 বাংলা | ০১ জুলাই ২০২৬
  • রেলশহর খড়গপুর। সারা দিন ট্রেনের হুইসেল আর ব্যস্ততার মাঝেই এই শহরের ছোট ট্যাংরা এলাকায় নীরবে শিল্পের আরাধনা করে চলেছেন বছর পঁচাত্তরের শিবাজী রাও। তাঁর হাত যেন আক্ষরিক অর্থেই সাক্ষাৎ সরস্বতীর বাসভূমি। বয়সের হিসেবে তিনি বার্ধক্যের কোঠায় পৌঁছলেও, তাঁর ক্যানভাসে জরা বা ক্লান্তির কোনও ছাপ নেই। বরং তুলির প্রতিটি টানে সেখানে উপচে পড়ে অদম্য তারুণ্য, সজীবতা আর প্রাণবন্ত এক আবেশ। জলরং, তেলরং থেকে শুরু করে মিক্সড মিডিয়া, শিল্পের প্রায় সব মাধ্যমেই তাঁর অবাধ ও সাবলীল বিচরণ।

    বিশেষ করে পোর্ট্রেট বা প্রতিকৃতি আঁকায় তাঁর যে নিখুঁত দক্ষতা ও মুন্সিয়ানা রয়েছে, তা যে কোনও শিল্পরসিকের নজর কাড়তে বাধ্য। সাদা কাগজ কিংবা ক্যানভাসে রং-তুলির নিপুণ আঁচড়ে তিনি জীবনের এমন রূঢ় ও সুন্দর বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তোলেন, যা দেখে বিস্মিত হতে হয়। পেশায় একসময় রেলকর্মী ছিলেন শিবাজীবাবু। তাঁর বাবাও রেলে কাজ করতেন। সেই সুবাদেই জন্ম লগ্ন থেকে এই খড়গপুরেই বেড়ে ওঠা তাঁর। ছোটবেলায় সংসারে খুব একটা আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। তাই ছবি আঁকা শেখার প্রবল ইচ্ছে মনের গভীরে থাকলেও প্রথাগত তালিম নেওয়ার সুযোগ তাঁর হয়ে ওঠেনি।

    কিন্তু শিল্পের প্রতি নিখাদ ভালোবাসাকে তো আর নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখা যায় না! কোনও নামিদামি আর্ট স্কুলে গিয়ে নয়, বরং বিভিন্ন শিল্পীদের রং-তুলির কাজ দেখে, এমনকি পাড়ার মৃৎশিল্পীদের প্রতিমা গড়ার কৌশল দিনের পর দিন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেই তিনি নিজে নিজে ছবি আঁকার পাঠ আয়ত্ত করেছেন। এরপর প্রতিদিন নিজের ইচ্ছে আর নিজস্ব ভাবনাকে স্বাধীনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ক্যানভাসে। কর্মজীবনেও তিনি যেমন নিজে অবসর সময়ে নানা ছবি এঁকেছেন, তেমনই বহু আগ্রহী মানুষকে শিখিয়েছেন শিল্পের খুঁটিনাটি। তবে অবসর জীবনে এসে তাঁর এই শিল্পীসত্তা যেন আরও বেশি করে ডানা মেলার সুযোগ পেয়েছে।

    আর জীবনের এই পর্যায়ে তাঁর আঁকার অন্যতম বড় সহযোগী তাঁরই সহধর্মিণী পুষ্পা। স্ত্রীর ছায়ার মতো সঙ্গ আর নিজের অক্লান্ত অধ্যবসায়, এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তাঁর প্রতিটি ছবি যেন আরও বেশি বাস্তব ও জীবনমুখী হয়ে ওঠে। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যেই তিনি প্রায় শতাধিক পোর্ট্রেট এবং নানা বিষয়ের উপর অসাধারণ সব ছবি এঁকে ফেলেছেন। তাঁর তুলির জাদুতে তৈরি হওয়া বেশ কিছু ছবি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রদর্শনীতে স্থান পেয়ে দর্শনার্থীদের বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে। কোনও প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই স্রেফ নিজের অদম্য আগ্রহ আর চেষ্টায় একজন শিল্পী কীভাবে তাঁর ক্যানভাসকে এতটা জীবন্ত করে তুলতে পারেন, শিবাজী রাও আজ সমাজের কাছে তারই এক উজ্জ্বল ও অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত।
  • Link to this news (News18 বাংলা)