• বর্ণবিদ্বেষ, গেরিলা দলে যোগ দেওয়ার চাপ পেরিয়ে জাতীয় নায়ক, কিনিওনেসের অবিশ্বাস্য উত্থান
    এই সময় | ০১ জুলাই ২০২৬
  • বিশ্বকাপের মঞ্চে মেক্সিকোর (Mexico) নতুন নায়ক এখন হুলিয়ান কিনিওনেস (Julian Quiñones)। ইকুয়েডরের (Ecuador) বিরুদ্ধে শেষ ৩২-এর ম্যাচে একটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করে দলের জয়ের অন্যতম কারগির হয়ে ওঠেন তিনি। ম্যাচ শেষে স্টেডিয়াম জুড়ে শুধু তাঁর নামেরই শব্দব্রহ্ম— ‘কিনিওনেস, কিনিওনেস’ ধ্বনিতে কেঁপে উঠছিল গ্যালারি। অথচ মাত্র দু’বছর আগেও মেক্সিকোতেই বর্ণবিদ্বেষী কটূক্তির শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। যে নাম একটা সময় অপমানের সঙ্গে উচ্চারিত হত, আজ সেই নামই কোটি সমর্থকের গর্ব, ভালোবাসা আর বিশ্বকাপ-স্বপ্নের প্রতীক।

    জন্মসূত্রে কলম্বিয়ার (Colombia) নাগরিক হুলিয়ান কিনিওনেস। আফ্রো-কলম্বিয়ান পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার ২০২৩ সালে মেক্সিকোর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু কাগজে-কলমে নাগরিকত্ব পেলেও সহজ ছিল না পথটা। প্রতিটি ম্যাচে, প্রতিটি স্পর্শে তাঁকে যেন প্রমাণ করে যেতে হয়েছে— তিনিও এই দেশেরই একজন, এই জার্সিরই যোগ্য দাবিদার।

    ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে তাঁর গোলটি ছিল গতি, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের অপূর্ব মেলবন্ধন। ডিফেন্ডারদের পিছনে ফেলে বক্সে ঢুকে দুরন্ত শটে জাল কাঁপানোর পর মেক্সিকোর ব্যাজে চুমু খেয়ে নিজের আবেগ উজাড় করে দেন তিনি। যেন এক গোলেই জবাব দিয়ে দেন অতীতের সব প্রশ্নের। একবার কিনিওনেস বলেছিলেন, ‘নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে বড় কিছু নেই। সেই সুযোগ পাওয়ার জন্য আমি সব সময় সর্বস্ব উজাড় করে দিই।’

    তবে তাঁর অবদান শুধু গোলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় গোলের পথও তৈরি করেন তিনি। নিখুঁত পাসে রাউল জিমেনেজ়কে গোলের সুযোগ করে দেন। গোল, অ্যাসিস্ট, লড়াই করার মানসিকতা এবং অফুরন্ত শক্তি— সব মিলিয়ে কিনিওনেস এখন শুধু মেক্সিকোর আক্রমণের অস্ত্র নন, দলের বিশ্বকাপের স্বপ্নপূরণে মেক্সিকোর বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে।

    গত মরশুমে সৌদি আরবের আল কাদসিয়ায় (Al Qadsiah) দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন হুলিয়ান কিনিওনেস। ৩৩ গোল করে গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে ছিলেন তিনি, পিছনে ফেলেছিলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনাল্দো (Cristiano Ronaldo) এবং আইভান টোনির (Ivan Toney) মতো তারকাদেরও। তবে সাফল্য তাঁর স্বভাব বদলাতে পারেনি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘রোনাল্দোর সঙ্গে তুলনা করার মতো আমি কেউ নই। আগে বলুন, আমার কত জন সমর্থক আছে?’

    কলম্বিয়ার এক দরিদ্র ও সংঘাতপ্রবণ এলাকায় বড় হয়েছেন হুলিয়ান কিনিওনেস। ছোটবেলায় শুধু দারিদ্র্যই নয়, আরও ভয়ঙ্কর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। যে অঞ্চলে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানে সশস্ত্র গেরিলা গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল প্রবল। এক সময় প্রায় গেরিলা দলে যোগ দিতে বাধ্য হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল তাঁর সামনে। কিন্তু ফুটবলই তাঁকে সেই অন্ধকার পথ থেকে দূরে সরিয়ে আনে।

    পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে ফুটবল বুট কেনার সামর্থ্যও ছিল না। তাই দীর্ঘ সময় খালি পায়েই ফুটবল খেলেছেন তিনি। পরে তাঁর শৈশবের কোচ সিজার ভ্যালেন্সিয়া (Cesar Valencia) নিজের টাকায় তাঁকে প্রথম বুট কিনে দেন। সেই ছেলেটাই আজ বিশ্বকাপের আলোয়। দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং অসংখ্য বাধা পেরিয়ে তিনি পৌঁছে গিয়েছেন মেক্সিকোর ফুটবল হৃদয়ে। আর ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে জয়ের রাতে গ্যালারিতে যখন হাজার হাজার কণ্ঠে শুধু তাঁর নাম ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন সেটাই ছিল তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের সবচেয়ে সুন্দর স্বীকৃতি।

  • Link to this news (এই সময়)