প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
ঘুমের ঘোরে মাঝেমধ্যে সংজ্ঞাহীন হয়ে যেত এক কিশোর। সঙ্গে খিঁচুনির উপসর্গও ছিল। ছেলের এই সমস্যা ধরা পড়ার পরে অনেক ডাক্তারের কাছেই ছুটেছেন বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা অশোককুমার নাগ। বলছিলেন, 'কলকাতার পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতেও গিয়েছি। অ্যালোপ্যাথি–হোমিয়োপ্যাথি অনেক করেছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। শেষে এক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের চিকিৎসায় এখন গত ১৫–১৬ বছর ধরে ছেলে অনেকটা ভালো আছে।'
এই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক হলেন কলকাতার জেবি রায় আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক কাশীনাথ সেনগুপ্ত। ঠাকুরদা সন্তোষকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন পঞ্চকোট রাজপরিবারের রাজবৈদ্য। প্রপিতামহ রামরেণু সেনগুপ্তও ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। তেমনই পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠার সুবাদে শৈশব থেকেই নানান ভেষজ উদ্ভিদ বা লতা-গুল্মের সঙ্গে পরিচয়। পরবর্তীকালে কলকাতার জেবি রায় আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে পাঠ নিয়েছেন।
এই চিকিৎসক বলছেন, 'আমাদের দেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি কমবেশি পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন। একটা উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। আয়ুর্বেদশাস্ত্র মতে মানবদেহে ১০৭টি মর্মস্থানে চিকিৎসার কথা বলা রয়েছে। চিনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ ভারতে এসে আমাদের দেশ থেকেই সেই চিকিৎসা পদ্ধতি শিখে চিনে ফিরে গিয়ে তা অনুসরণ করেন। পরবর্তীকালে সেই দেশের গবেষকরা শরীরের আরও বেশি সংখ্যায় মর্মস্থানের সংখ্যা খুঁজে বেরকরে আকুপাংচার চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন।'
ভারতের কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন ক্ষারসূত্র বা পঞ্চকর্ম চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে অনেক দুরারোগ্য রোগ থেকে মানুষ মুক্তি পাচ্ছেন বলে দাবি তাঁর। তাঁর কথায়, 'আগে যুদ্ধে নাক কেটে দেওয়া হতো বা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হলেও নাক বসে যেত। সুশ্রুত সেই নাক সার্জারি করতেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে। যাকে রাইনো প্লাস্টিক সার্জারি বলা হতো।' এ ছাড়া হার্টের ব্লকেজ বা একজি়মা, আলসার, প্রেশারের বা লিভারের নানা সমস্যাতেও আয়ুর্বেদে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।
একদা পুরুলিয়ার পাড়ায় শৈশব বা ছাত্রজীবন কেটেছে কাশীনাথের। কর্মসূত্রে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তিনি কাজ করছেন আয়ুর্বেদ নিয়েই। কিন্তু শিকড়ের টান আজও অনুভব করেন প্রতিনিয়ত। বলেন, 'ছোটবেলা থেকে আমি পুরুলিয়ার দারিদ্র দেখেছি। এই মানুষগুলি বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে যখন আমাকে ফোন করেন, তখন আর থাকতে পারি না। না হলে তো ওঁদেরই কলকাতায় ছুটতে হবে। সেই খরচটুকুও ওঁদের কাছে বাড়তি বোঝা। আমিই চলে আসি। সবার সঙ্গে দেখা হয়। এটা তো আমার কাছেও প্রাপ্তি।' পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের বাসিন্দা অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'আমি সুগারের সমস্যায় আক্রান্ত। দীর্ঘ আট-ন'বছর তাঁর কাছেই আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় রয়েছি। অনেক ভালো রয়েছি।' পুরুলিয়া শহরের বাসিন্দা গৌতম রায়ের কথায়, 'আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতিকে কী ভাবে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে চলেছেন এই চিকিৎসক। পুরুলিয়ার বহু গরিব মানুষ স্বল্প খরচে তাঁর চিকিৎসায় উপকৃত হয়েছেন। উনি দীর্ঘদিনই কলকাতার বাসিন্দা। কিন্তু আজও পুরুলিয়ার গরিব মানুষগুলির জন্য নিয়মিত ছুটে আসেন।'
কাশীনাথ বলছেন, 'যে খাবার থেকে বিভিন্ন আনমেটাবলাইজ়ড প্রোডাক্টগুলি রক্তে জমে, তা থেকেই তো শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয়। আয়ুর্বেদে গোড়া থেকে সেই রোগগুলি নির্মূল করার কথা রয়েছে।' তাঁর সংযোজন, 'দিনচর্চা বা ঋতুচর্চার উপরে আমি জোর দিই। আমাদের দেশের প্রাচীন আয়ুর্বেদে এই দুই চর্চার কথা বলা রয়েছে। সেটা মেনে চলতে পারলেই অনেক রোগ থেকে মুক্তি মিলবে।'