কৌশিক ভট্টাচার্য, সুজয় মুখোপাধ্যায়
গড়গড়ার নলটা মুখ থেকে সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জনাইয়ের জমিদার কালীচরণ মুখোপাধ্যায়। নাহ্, গোরা সাহেবগুলোকে বোধহয় আর বশ করা গেল না। ঘর জুড়ে ক্যাওড়া আর জায়ফলের গন্ধ ম ম করছে। কিন্তু কর্তার মুখ বিষণ্ণ।
মিষ্টি নিয়ে জমিদার বাড়িতে এসেছিলেন ন্যাড়া ময়রা। কর্তাকে এমন বিরস বদনে বসে থাকতে দেখে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলেন তিনি, ‘বড়বাবা, অপরাধ নেবেন না। কিছু নিয়ে চিন্তা করছেন মনে হচ্ছে।’ ময়রাকে দেখে মাথায় যেন বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে উঠল। এই মানুষটাই পারবে। আরামকেদারা থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন কালীচরণ, ‘বলি, মিষ্টি তো অনেক বানালে। কিন্তু রসও থাকবে, আবার শুকনোও হবে, এমন মিষ্টি বানাতে পারবে?’
রস আবার শুকনো! কর্তা কি রসিকতা করছেন নাকি? প্রথমটা ঠাওর করতে পারেননি। কিন্তু তিনিও ন্যাড়া ময়রা। চ্যালেঞ্জটা নিয়েই নিলেন, ‘পারব বড়বাবা।’ বাকিটা কিংবদন্তি। সেই মিষ্টি গোরা সাহেব মুখে পুরতেই... ব্যস, এক লহমায় যেন কোন সুদূরে ভেসে গেলেন। চোখ বন্ধ। যেন বৃষ্টি ভেজা ইংল্যান্ডের গ্রাম, প্রেয়সীর হাসিমুখ, সব মনে পড়ে যাচ্ছে তাঁর। কালীচরণের ডাকে চটক ভাঙল। ওই মিষ্টি মুখে নিয়েই ভাঙা বাংলায় কোনও রকমে বললেন, ‘তুমি আমার মন হরণ করিয়া নিয়াছ।’ নাম হলো ‘মনোহরা’।
না, কোনও ইতিহাস বইয়ে এই গল্প পাওয়া যায় না। তবে হুগলির জনাইয়ে কান পাতলে সাহেব, কালীচরণ আর ন্যাড়া ময়রার কথা লোকের মুখে মুখে শোনা যায়। অনেকে আবার ভীমচন্দ্র নাগকেও টেনে আনেন। তিনি নাকি এক সময়ে জনাইয়ের ময়রা পাড়ায় থাকতেন। ভীমের বংশধরদের হাতেই নাকি অমৃতসমান এই মিষ্টির সৃষ্টি। কেউ কেউ তো আবার খোদ এক ইংরেজ সাহেবকেই মনোহরার কলম্বাস বানিয়ে ছেড়েছেন।
মনোহরা প্রায় কলকাতারই বয়সি। মানে ওই ২৫০-৩০০ বছর বয়স আর কী। ফলে তার সৃষ্টি নিয়ে গল্পগাথার শেষ নেই। কিন্তু মন হরণ করে নেওয়া এই মিষ্টির কারিগররা এতদিন নীরবে-নিভৃতেই ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পরে তাঁদের কপাল খুলেছে। জনাইয়ের মনোহরাকে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই ট্যাগ) দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার পরে থেকে আশায় বুক বাঁধছেন ব্যবসায়ীরা। এ বার চাহিদা আরও বাড়বে। দেশ পেরিয়ে বিদেশেও বিজয় কেতন ওড়াবে বাংলার মনোহরা। এর গায়ে সহজে সময়ের ছাপ পড়ে না। ফ্রিজের আশ্রয় ছাড়াই দিনের পর দিন স্বাদ আর গন্ধ অটুট থাকে। বাইরের চিনির মিহি আবরণ যেন এক অদৃশ্য রক্ষাকবচ—ভেতরের নরম ছানার পুরকে যত্নে আগলে রাখে, দীর্ঘ সময় থাকে তাজা, স্নিগ্ধ।
মনোহরার ভিতরে লুকিয়ে থাকে ছানার পুর। নরম, মোলায়েম, একেবারে রেশমি কাপড়ের মতো। প্রথম কাজ হলো ‘জাঁক’ দেওয়া। এটাই মিষ্টির প্রাণ। জাঁক যত ভালো, ছানা তত নরম। দুধ কাটানোর পরে গামছার ভিতরে তাল তাল ছানা ঢুকিয়ে শিকে টাঙিয়ে রাখা হয়। যাতে শেষ জলটুকুও ঝরে যায়।
এ বার দু’টো পেল্লায় সাইজের কাঠের বারকোষের মাঝে রাখা হয় ছানার তাল। আর তার উপরে চেপে বসেন এক ময়রা। তাঁর শরীরের ওজনই জাঁকের কাজ করে। এ ভাবে কেটে যায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। তার পরে গামছা খুলতেই বেরিয়ে আসে মাখনের মতো মসৃণ ছানা। তাতে মেশানো হয় চিনি, এলাচ, জায়ফল। এ বার উনুনে তোলার পালা। জ্বাল দিয়ে পাক হবে। অনেকটা কাঁচা গোল্লার মতো হয়ে এলে সেটা ঠান্ডা করে দুই হাতে ঘি মাখিয়ে শুরু হয় গোল গোল মনোহরা গড়ার কাজ।
একেবারে শেষে গরম চিনির রস বা গুড়ে ডুবিয়ে রাখা হয় ১০-১২ ঘণ্টা। তার পরে তুলে নেওয়া হয়। এই মিষ্টি মুখে দিলেই জিভে রসের প্লাবন ওঠে। অথচ বাইরেটা শুকনো খটখটে। অনেক সময়ে চিনির একটা কড়কড়ে স্বাদ থাকে। কিন্তু একবার জিভ চালালে সেটাও মিলিয়ে যায়। তখন শুধু রস আর শুকনো খোলসের খেলা। সঙ্গে এলাচ, জায়ফলের একটা ভুরভুরে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে জিভে। তার পরে কন্ঠনালী পেরিয়ে নাকে টোকা মারতে থাকে। মনে বলে ওঠে, ‘তুমি যে ফাগুন রঙের আগুন তুমি যে রসের ধারা/ তোমার মাধুরী তোমার মদিরা করে মোরে দিশাহারা।’
তবে গুড়ের মনোহরা শীতকালেই ভালো। নলেন গুড়ের তুলনা সে নিজেই। মিষ্টিপ্রেমীদের কাছেও গুড়ের মনোহরার তাই আলাদা মর্যাদা। তবে দুধ আর ছানাই কিন্তু আসল। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের উপর এখন পড়েছে সময়ের ছাপ। শুধু দামই বাড়েনি, বদলাচ্ছে মনোহরার স্বাদও। ইদানীং গুঁড়ো দুধের তৈরি মনোহরায় অনেকেই গা ভাসাচ্ছে। এই নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন জনাইয়ের মিষ্টি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কৃষ্ণচন্দ্র সাউ।
খাঁটি গোরুর দুধ আর পাউডার দুধের কোনও তুলনা হয়? দু’দিকে মাথা নাড়তে নাড়তে কৃষ্ণচন্দ্র বললেন, ‘একেবারেই নয়। পাউডার দুধের জন্য মনোহরার স্বাদ বদলে যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, আগের সেই মন কেমনিয়া টান যেন আর নেই।’ গোদের উপরে বিষ ফোঁড়ার মতো দাম বাড়ছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে গ্যাস সঙ্কটে যখন ব্যবসায়ীদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে, তখনই আশার আলো নিয়ে এসেছে জিআই ট্যাগ। তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে টেবিলের উপরে টরে টক্কা বাজাতে বাজাতে কৃষ্ণচন্দ্র বলে উঠলেন, ‘আলবাত উপকার হবে। রপ্তানি বাড়বে। আরও উন্নত মানের মনোহরা তৈরির চেষ্টাও করছি আমরা।’
জনাই এলাকায় কুড়িটি মিষ্টির দোকান রয়েছে। মিষ্টি ব্যবসায়ী স্বপনকুমার দাস বলেন, ‘GI স্বীকৃতি পাওয়ার পরেই দোকানে কেনাবেচা অনেকটা বেড়ে গিয়েছে।’ স্থানীয় এক মিষ্টি দোকানের কর্মী তপন চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বাইরে থেকে বহু ক্রেতা শুধু মনোহরা কেনার জন্যই এখানে আসছেন। এই এলাকার অনেকে দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, আরবে থাকেন। এখান থেকে তারা এই মিষ্টি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।’ নজরকাড়া নিখুঁতিও জনাইয়ের বিশেষত্ব। বাইরের সোনালি ভাজা খোলস যেন মুচমুচে এক আলতো আলিঙ্গন, অন্তরে রসসিক্ত ছানার হৃদয়। স্বাদের ধীর বিস্ফোরণে চোখ বুজে আসে, জিভে থেকে যায় জনাইয়ের ঐতিহ্যের দীর্ঘ, মধুর অনুরণন।
‘হাঁ’ করলেই যেমন হাওড়া ধরে নেয় লোকে, তেমনই জনাই বললে মনোহরা। এখানকার ট্রেডমার্ক। পুজো-পার্বনে আত্মীয়স্বজনরা আসেন। তখন বিক্রিবাটাও বাড়ে। মনোহরা বেঁধেছেঁদে বাড়িতে নিয়ে যান তাঁরা। পাড়া-প্রতিবেশীকে দেন। গল্প আড্ডার পরতে পরতে জমতে থাকে মিষ্টি স্বাদ, ‘ভূবনো মোহনো গোরা, কোন মণিজনার মনোহরা’। এর স্বাদ তো হৃদমাঝারে রাখার মতোই। শোনা যায়, সুরসম্রাট নিধুবাবু নাকি টপ্পার বোলের সঙ্গে মনোহরার রস মিশিয়ে গেয়েছিলেন, ‘খাওয়াইব গন্ডা গন্ডা মনোহরা দেদো মণ্ডা/ খেয়ে খেয়ে যাবে প্রাণটা, বলবে বলিহারি যাই।’