• জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে এক নিঃস্বার্থ কমিউনিস্ট
    আজকাল | ০২ জুলাই ২০২৬
  • সৌরভ গোস্বামী:  "তিনি বৃদ্ধ হলেন… বৃদ্ধ হলেন…বনষ্পতির ছায়া দিলেন সারাজীবন। এই বুড়ো গাছের পাতায় পাতায়...সবুজ কিন্তু আজো মাতায়। সুঠাম ডালে।"

    বয়সটা স্রেফ একটা সংখ্যা মাত্র। রজতশুভ্র কেশ, পরনে চেনা সফেদ ধুতি-ফতুয়া, আর ডাল-ভাত-আলুচচ্চড়ির যাপনে আজও যিনি অবিচল। ৮৭ বছর বয়সে পা দিলেন বাংলার বাম রাজনীতির অন্যতম অভিভাবক বিমান বসু। এই বয়সে যখন আর পাঁচটা মানুষ বিশ্রামের খোঁজ করেন, তিনি তখন ধবধবে সাদা চুলে রাজ্যের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়ান। কোনও  আলিশান বাংলো বা ক্ষমতার মোহ নয়, আলিমুদ্দিনের একচিলতে পার্টি অফিসই যাঁর আজীবনের ঠিকানা। তাঁর এই আজন্ম সততা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা আর ক্লান্তিহীন লড়াইকে উপরিউক্ত গানের কথাগুলি।

    সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি এই প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতার জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে। বোলপুরে দলের সম্মেলনে তিনদিন থাকার পর, নিজের পোশাক নিজেই কেচে পরম যত্নে ব্যাগে গুছিয়ে রাখছেন তিনি। ৩৪ বছর বামফ্রন্ট রাজ্যে ক্ষমতায় থাকলেও, বিমানবাবু নিজে কখনো কোনও  সরকারি ক্ষমতার অলিন্দে যাননি। এমনকি তাঁর চরম বিরোধীরাও কখনো তাঁর সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেনি।

    তবে এই কঠোর কমিউনিস্টের ভেতরেও লুকিয়ে রয়েছে এক অসম্ভব সংবেদনশীল মানুষ। বাচ্চাদের অন্নপ্রাশনে তিনি যান না, কারণ নিজের বলতে তাঁর কোনও  টাকাপয়সা নেই, উপহার দিতে পারবেন না ভেবে মন খারাপ হয়। অথচ কলেজ স্কোয়ারে বইয়ের স্টল উদ্বোধনে গিয়ে কোনও  খুদেকে পরম স্নেহে আঁকার বই উপহার দেওয়া, কিংবা পদযাত্রার ক্লান্তি কাটাতে হরিণঘাটায় গিয়ে ওখানকার বাচ্চাদের নিয়ে খেলায় মেতে ওঠার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান জীবনের অনাবিল আনন্দ।

    এই বৈষয়িক সব পিছুটান ছেড়ে এক কাপড়ে রাজনীতির পথে চলে আসার শুরুটা হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, রাসবিহারী মোড়ে পুলিশের তাড়া খাওয়া একদল মানুষের মুখে স্লোগান শুনে। সেই ৮ বছরের বালকের মনে যে প্রশ্ন জেগেছিল, তার উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই তিনি একদিন নিজের ঘর ছেড়েছিলেন। আজ জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে বিমানবাবুর স্মৃতির মণিকোঠায় সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন তাঁর মাস্টারমশাই সুবিমল রায় (সত্যজিৎ রায়ের জ্যাঠামশাই) এবং তাঁর মা হেমবরণী বসু। বিমানবাবু অকপটে স্বীকার করেন, মা যদি না থাকতেন, তবে তাঁর পক্ষে কমিউনিস্ট পার্টি করা বা রাজনীতিতে আসা হয়তো কোনোদিনই সম্ভব হতো না।

    আজকের ঝকঝকে কর্পোরেট রাজনীতির যুগে দাঁড়িয়েও বিমান বসুর এই যাপন প্রমাণ করে, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরার নাম নয়, তা আসলে মানুষের জন্য নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার এক আজীবন ব্রত। সময়ের নিয়ম মেনে আজ তিনি ৮৮ ছুঁলেন। চোখেমুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট, তবুও মনের গভীরে লালন করেন সেই 'শ্রেণীহীন সমাজের চিরবাসনা'। তাঁর এই রূপ দেখেই মনের কোণে বেজে ওঠে সেই গানের লাইন—

    "দেখো বইছে এখন বয়েসকালেপাতায় পাতায় এবং ডালেকালের ওজন।তিনি বৃদ্ধ হলেন, বৃদ্ধ হলেনআমায় ছেড়ে বুড়ো হলেনআমার সুজন।"
  • Link to this news (আজকাল)