সজল মণ্ডল, রঘুনাথপুর: চা, চপ শিল্প নিয়ে রাজ্য রাজনীতি বেশ কয়েক বছর ধরেই তোলপাড়। আজ সেই চা ও চপ শিল্পের দৌলতে রঘুনাথপুর শহরে চিরস্মরণীয় হয়ে থেকে গেলেন ভোন্দু ওরফে দুর্গাদাস কর। রঘুনাথপুরে শহরে তাঁর নামে ‘ভোন্দুর মোড়’ গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সেই মোড়কে কেন্দ্র করে বিশাল সব অট্টালিকা ও একাধিক দোকানপাট গড়ে উঠেছে। কোনো এক সাধারণ ব্যক্তির জীবন্ত অবস্থায় সরকারি স্বীকৃতি হিসেবে মোড়ের নাম নজিরবিহীন। সেই ভোন্দু (৮১) মঙ্গলবার রঘুনাথপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগছিলেন। দুর্গাদাসবাবুর প্রয়াণে এলাকার মানুষ শোকাহত। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। তাঁর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞ জানাতে এলাকার ব্যবসায়ীদের তরফে আজ, বৃহস্পতিবার সমস্ত দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পালন করা হবে স্মরণ সভাও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে যে স্থানটি ভোন্দুর মোড় নামে বিখ্যাত একদা সেটি শহর থেকে অনতিদূরে ছিল। অর্থাৎ, শহর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সমস্ত এলাকাটি ছিল জনশূন্য। একটি মাত্র চালকল ছিল। সেখানে ভোন্দুর বাবা ছোট্ট একটি চা ও পকড়ির দোকান করতেন। সেই দোকানে চালকলের শ্রমিকরা চা ও পকড়ি খেতে আসতেন। অষ্টম শ্রেণি পাশ করার পর ১৫ বছরের ভোন্দু বাবার দোকানে বসে ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৬০ সালে সেই দোকান থেকে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। শুরু করেন চপ ভাজতে। ধীরে, ধীরে চা ও চপ বিখ্যাত হয়ে যায়। দূর দূরান্তের লোক দোকানে চা ও চপ খেতে আসতেন। ধীরে ধীরে জায়গাটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। একে, একে বিভিন্ন দোকানপাট, বাসভবন গড়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালে জায়গাটি ভোন্দুর মোড় হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। সরকারিভাবে জায়গাটির নামকরণও করা হয়।
এলাকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, রঘুনাথপুর শহরের-১ নম্বর ওয়ার্ডের মিউনিসিপাল ম্যানেজমেন্ট হাই স্কুলের কাছে ভোন্দুর বাসভবন। সামান্য দোকান থেকে তিনি ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছেন। বর্তমানে স্ত্রী, তিনটি মেয়ে ও একটি ছেলে সহ নাতি, নাতনি রয়েছে। ছেলে ও মেয়ে সকলের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
সহকর্মীকে হারিয়ে মন খারাপ এলাকার ব্যবসায়ী গোপাল মিশ্র, সুভাষ গড়াই, সমীর মিশ্রদের। তাঁরা বলেন, ভোন্দুবাবুর নামে মোড়ের নামকরণ। কয়েক দশক ধরে এই এলাকায় আমরা ব্যবসা করছি। আজ, দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্মরণসভাও করা হবে।’ রঘুনাথপুর শহরের-১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার প্রণব দেওঘরিয়া, ওয়ার্ডের বাসিন্দা তথা প্রাক্তন চেয়ারম্যান ভবেশ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘দুর্গাদাসবাবু চিরস্মরণীয় হয়ে রয়ে গেলেন। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।’ জেলা বিজেপি নেতা তথা ওয়ার্ডের বাসিন্দা বাণেশ্বর মুখোপাধ্যায় বলেন, একজন জীবন্ত মানুষের নামে আস্ত একটি মোড় গড়ে ওঠা সত্যিই অভাবনীয়।’
একবার এক সাক্ষাৎকারে ভোন্দু বলেছিলেন, ‘তেলে ভাজার দোকান বলে আমার দুঃখ নেই। আমার নামে মোড়ের নামকরণ হয়েছে, এটাই বড়। ক’জনের জীবনে এটা হয়।’ জীবনের শেষদিনেও তিনি বলতে চেয়েছিলেন— ‘আমার নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’ হয়তো বলেছিলেন। ফাইল চিত্র