এই সময়: আগের তৃণমূল জমানায় দল আর সরকার একাকার হয়ে গিয়েছিল বলে বারবার অভিযোগ করত বিরোধী দলগুলি। কিন্তু বাংলার বিজেপি সরকার রাজ্যের আমলাদের পূর্বতন সরকারের মতো কোনও ভাবে রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত করবে না— বুধবার রাজ্যের ডব্লিউবিসিএস (এগজি়কিউটিভ) অফিসারদের সঙ্গে বৈঠকে এই বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আগের সরকারের চাপেই হোক বা অন্য কোনও কারণে, আমলাদের একাংশ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলেও জানান শুভেন্দু। বর্তমান জমানায় তেমনটা আর করা যাবে না বলেও নরমে–গরমে বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী।
রাজ্যের আমলা অর্থাৎ ডব্লিউবিসিএস অফিসারদের তিনি একটি সুখবরও দিয়েছেন এ দিন। এতদিন ট্রান্সফার ভাতা হিসেবে তাঁরা তিন হাজার টাকা পেতেন। এ বার থেকে তাঁরা ওই খাতে ৫০ হাজার টাকা পাবেন। এই স্তরের আমলারা এতদিন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল হেল্থ স্কিম’-এর সুবিধা পেতেন। এ বার থেকে তাঁরা ‘সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হেল্থ স্কিম’-এর সুবিধা পাবেন। দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি তাঁরা জানিয়ে আসছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় খুশি ডব্লিউবিসিএস অফিসারদের বড় অংশ।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে শুভেন্দু এই প্রথম ডব্লিউবিসিএস আধিকারিকদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠক থেকেই প্রশাসনের প্রতি নিজের সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘ভয়, চাপ কিংবা অন্য কোনও কারণে নিচুতলার একাংশের আধিকারিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন।’ তবে সেই পরিস্থিতি থেকে প্রশাসনকে বের করে আনতেই হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত আধিকারিকদের উদ্দেশে শুভেন্দু বলেন, ‘আগের সরকারের আমলে আপনাদের তো রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত করা হয়েছিল। এই জমানায় আর তা হবে না।’ তাঁর সংযোজন, ‘আপনাদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করব না, নির্বাচনে রাজনৈতিক কর্মী বানাব না।’ তিনি এও জানান, আধিকারিকদের পেশাগত মর্যাদা এবং সিনিয়রিটির বিষয়েও তাঁর সরকার সম্পূর্ণ গুরুত্ব দেবে।
পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলের প্রশাসনিক সংস্কৃতি নিয়েও এ দিন তীব্র সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দুর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন বহু আধিকারিক। এখন সেই পরিবেশ বদলানোই তাঁর সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এই প্রসঙ্গে তিনি অবসরপ্রাপ্ত আইএএস, বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য পরামর্শদাতা সুব্রত গুপ্তর নামও উল্লেখ করেন। শুভেন্দু জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পরে তিনি সুব্রত গুপ্তকে ফের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁর দাবি, পূর্বতন জমানায় তাঁকে দিল্লিতে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই সরকার তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে। এ দিনের অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন সুব্রত। শুভেন্দুর অভিযোগ, অতীতে আইএএস এবং আইপিএস আধিকারিকদের মঞ্চে বসিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে রাজনৈতিক আক্রমণ করা হতো। সেই প্রবণতাও তাঁর সরকার বন্ধ করতে চায় বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৈঠকে পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছিল। এমনকী মিড ডে মিল প্রকল্পের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। করমণ্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় আহতদের সাহায্যের জন্য সেই তহবিল থেকে টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রশ্ন, ‘এ ভাবে সরকারি প্রকল্পের টাকা ব্যবহার করা যায় নাকি?’ রাজ্যের আমলাদের ভরসা দিতে তিনি মনে করিয়ে দেন, সরকারের কাজ বাস্তবায়ন করেন প্রশাসনিক আধিকারিকরাই। তাই তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘যে কাজ করবেন, আমার কাছে তিনিই সেরা।’
ডব্লিউবিসিএস অফিসারেরা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দাবিদাওয়া জানিয়ে আসছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো ট্রান্সফার ভাতা। আইএএস অফিসারেরা এই ভাতা হিসেবে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা পান। সেখানে ডব্লিউবিসিএস অফিসাররা বহু বছর ধরে মাত্র তিন হাজার টাকা পেতেন। এ দিন সেই ভাতা ৫০ হাজার টাকা করার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। আইএএস অফিসারদের মতো ডব্লিউবিসিএস (এগজ়িকিউটিভ) অফিসাররাও এখন সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হেল্থ স্কিম-এর সুবিধা পাবেন।