ফোলারিন বালোগান (Folarin Balogun) লালকার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়াম। গ্যালারিতে নেমে আসে অস্বস্তিকর নীরবতা, হতাশা স্পষ্ট ফুটে ওঠে আমেরিকার (United States) খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের মুখে। তখন মনে হচ্ছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, আর বিশ্বকাপে মরিসিও পোচেত্তিনোর (Mauricio Pochettino) দলের দুর্দান্ত যাত্রাও হয়তো বড় ধাক্কার মুখে পড়তে চলেছে। কিন্তু সেই কঠিন পরিস্থিতিতেই নিজেদের চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি দেখিয়েছে আমেরিকা। ১০ জন নিয়ে প্রায় আধঘণ্টা খেলেও দমে যায়নি তারা। বরং রক্ষণে অসাধারণ দৃঢ়তা দেখানোর পাশাপাশি শেষ দিকে মালিক টিলম্যানের (Malik Tillman) অনবদ্য ফ্রি-কিকে ২-০ গোলের জয় নিশ্চিত করে তারা। সেই সঙ্গে বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনাকে (Bosnia and Herzegovina) বিদায় জানিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করেছে আয়োজকরা।
প্রথমার্ধে আধিপত্য, গোল পেলেন বালোগান
শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চেয়েছিল আমেরিকা। গ্যালারিভর্তি দর্শকদের সমর্থনে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে মার্কিনরা। ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই ক্রিস্তিয়ান পুলিসিচ বাঁদিক থেকে ভেতরে ঢুকে প্রতিপক্ষের কয়েক জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে শট নেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা ব্লক করে বিপদমুক্ত হয় বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনা। অন্যদিকে বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনাও থেমে থাকেনি। ম্যাচের শুরুতেই গোলরক্ষক ম্যাট ফ্রিজ়কে একটি কঠিন সেভ করতে হয়। কর্নার থেকে তরুণ কেরিম আলাইবেগোভিচ সরাসরি গোল করার সাহসী চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সতর্ক ফ্রিজ় বলটি প্রতিহত করেন।
প্রথমার্ধ যত এগোতে থাকে, আমেরিকার আক্রমণের তীব্রতাও তত বাড়তে থাকে। সার্জিনো ডেস্ট বারবার প্রতিপক্ষের পিছন থেকে আক্রমণ তৈরি করছিলেনন, ওয়েস্টন ম্যাককেনি মাঝমাঠের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, আর বালোগান ক্রমাগত বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখছিলেন।
৩২ মিনিটে মনে হয়েছিল, অবশেষে কাঙ্ক্ষিত গোল পেয়ে গিয়েছে আমেরিকা। ডেস্টের চাপে বল হারায় বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনা, সেখান থেকে ম্যাককেনির পাস পেয়ে নিখুঁত ফিনিশে বল জালে জড়িয়ে দেন বালোগান। স্টেডিয়াম জুড়ে তখন উল্লাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ভিডিয়ো রিভিউয়ে দেখা যায়, বালোগান সামান্য অফসাইডে ছিলেন। ফলে গোল বাতিল হয়ে যায়।
তবে সেই হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে আবারও সুযোগ পান বালোগান। টিম রিমের বুদ্ধিদীপ্ত পাস থেকে শুরু হওয়া আক্রমণে ম্যাককেনি ও মালিক টিলম্যানের চমৎকার সমন্বয়ের পর বল পৌঁছে যায় তাঁর কাছে। এ বার আর ভুল করেননি মার্কিন স্ট্রাইকার। দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বল জালে পাঠিয়ে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই আরও একটি গোল পেতে পারতেন বালোগান। ডেস্টের হেড থেকে পাওয়া সুযোগে তাঁর শট ক্রসবারের উপরের অংশ ছুঁয়ে বাইরে চলে যায়।
লালকার্ডে চাপে পড়ে আমেরিকা
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনার জন্য বড় ধাক্কা ছিল অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার এদিন জেকোর চোট। ৫০ মিনিটের মাথায় তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়। তখন মনে হচ্ছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ একেবারেই নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে আমেরিকা। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো চিত্র বদলে যায়। ৬৪ মিনিটে একটি লুস বলের পিছনে ছুটতে গিয়ে বালোগান ও তারিক মুহারেমোভিচের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বলের জন্য লড়াই করতে গিয়ে বালোগানের পা প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের গোড়ালিতে লাগে। প্রথমে খেলা চলতে থাকলেও পরে ভিডিয়ো অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির পরামর্শে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি দেখেন রেফারি রাফায়েল ক্লাউস।
রিপ্লে দেখার পর তিনি সরাসরি লালকার্ড দেখান বালোগানকে। সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আমেরিকার খেলোয়াড়দের মুখে হতাশা নেমে আসে। দর্শকরাও বিস্মিত হয়ে যান। কারণ অনেকের কাছেই ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত মনে হয়নি। তবে সিদ্ধান্ত বদলানোর আর সুযোগ ছিল না। ফলে ম্যাচের বাকি প্রায় আধঘণ্টা ১০ জন নিয়েই খেলতে হয় আমেরিকাকে।
টিলম্যানের জাদুকরী মুহূর্ত, ইতিহাস গড়া জয়
একজন কম নিয়ে খেললেও আমেরিকা রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে শুধু সময় নষ্ট করার পথ বেছে নেয়নি। বরং সংগঠিত ভাবে রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে উঠেছে তারা। এ দিকে আমেরিকা দশ জন হয়ে যাওয়ায় বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। কিন্তু মার্কিন ডিফেন্ডাররা একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করে ম্যাচে নিজেদের এগিয়ে রাখেন। এর পর ৮২ মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক আদায় করে নেয় আমেরিকা। দায়িত্ব নেন মালিক টিলম্যান।
চাপের সেই মুহূর্তে অসাধারণ এক শট নেন তিনি। বলটি দেওয়ালের উপর দিয়ে বাঁক খেয়ে ক্রসবারের নিচ দিয়ে জালে ঢুকে যায়। বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনার গোলরক্ষক নিকোলা ভাসিলজ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বলটি আটকাতে পারেননি। মালিক টিলম্যানের সেই অনবদ্য ফ্রি-কিকেই ২-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় আমেরিকার। এই জয় শুধু শেষ ষোলো নিশ্চিত করার নয়, আমেরিকান ফুটবলের জন্যও একটি বিশেষ মুহূর্ত। ২০০২ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল আমেরিকা। দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচ জিতে নিজেদের শক্তির জানান দিল তারা।
এ বার শেষ ষোলোয় তাদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। কাকতালীয় ভাবে, ২০১৪ বিশ্বকাপে অতিরিক্ত সময়ে বেলজিয়ামের কাছেই বিদায় নিতে হয়েছিল আমেরিকাকে। সেই স্মৃতি এখনও অনেকের মনে তাজা। এ বার তাই অপেক্ষা প্রতিশোধের। সবচেয়ে বড় কথা, বসনিয়া ও হার্জ়েগোভিনার বিপক্ষে এই ম্যাচে আমেরিকা দেখিয়েছে তারা শুধু প্রতিভাবান একটি দল নয়, কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করেও ফল বের করে আনার মানসিক শক্তি তাদের আছে। আর বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে অনেক সময় এই গুণটিই দলকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়।