অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদানের টাকা ও সোনা-দানা চুরির মামলায় মূল অভিযুক্ত রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিন্নু যাদবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী ও গাড়িচালক। এই ঘটনায় তিন্নু সহ মোট ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে অযোধ্যা পুলিশ। চম্পত রাই এখন অভিযোগ করছেন, এই অনুদান চুরি কর্মকাণ্ডের মূল মাথা তিন্নু যাদবই। শুধু তাই নয়, প্রাক্তন ট্রাস্ট প্রধানের কথায়, তাঁর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন তাঁরই গাড়ি চালক।
নব্বইয়ের দশকে অযোধ্যার নয়া ঘাটের কাছে একটি ছোট চায়ের দোকান চালাতেন তিন্নু যাদবের বাবা। তিন্নু নিজে একসময় অযোধ্যায় অটো ও টেম্পো চালাতেন। সেখান থেকে চম্পত রাইয়ের সান্নিধ্যে এসে তাঁর ব্যক্তিগত চালক ও অত্যন্ত বিশ্বস্ত অনুগামী হয়ে ওঠেন তিনি। চম্পত রাইয়ের ওপর অগাধ প্রভাব খাটিয়ে তিন্নু আস্তে আস্তে রাম মন্দিরের অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ব্যবস্থায় নিজের আধিপত্য কায়েম করে বলে অভিযোগ। মন্দিরের অনুদানের গোনা ও সুরক্ষার দেখভালের দায়িত্বও তাঁর হাতে চলে আসে। এই সুযোগে তিন্নু তাঁর ভাইপো মণীশ যাদবকেও টাকা গোনার দলে ঢুকিয়ে দেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চম্পত রাই জানিয়েছেন, তিনি তিন্নুকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন এবং তাঁর পক্ষে এমন কাজ করা সম্ভব তা কোনওদিন ভাবতেও পারেননি। চম্পতের কথায়, ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের অসহায় ও অভাবী আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার যে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার সুবিধাই নিয়েছিলেন তিন্নু।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাম মন্দিরের দানবাক্স থেকে জমা হওয়া টাকার অঙ্কে গরমিল লক্ষ্য করছিলেন ট্রাস্টের কর্মকর্তারা। সাধারণত প্রতিটি দানবাক্সে ৭ থেকে ৮ লক্ষ টাকা থাকার কথা থাকলেও, ৫০০ টাকার নোটের বান্ডিলগুলো মাঝে মাঝেই উদ্ধার হয়ে যেত।
সূত্রের খবর, সন্দেহ দানা বাঁধতেই চম্পত এবং ট্রাস্টের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একটি গোপন পরিকল্পনা করেন। টাকা গোনার ঘরে সাধারণ সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা আগে থেকেই বসানো ছিল, যার অবস্থান কর্মীরা জানতেন। কিন্তু ট্রাস্টের তরফে অত্যন্ত গোপনে সেখানে বেশ কয়েকটি ‘হিডেন ক্যামেরা’ বা গোপন ক্যামেরা বসানো হয়।
সূত্রের খবর, পরবর্তী এক সপ্তাহের গোপন ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখতেই তদন্তকারীদের চোখ কপালে ওঠে। দেখা যায়, প্রকাশ্য সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা যেখানে ক্যামেরার নজর পৌঁছয় না, তা খুব ভালো করেই জানত চোরেরা। টাকা গোনার সময় কিছু কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যেতেন যাতে ক্যামেরার ভিউ আটকে যায়। আর সেই সুযোগে অন্য সহযোগীরা টাকার বান্ডিল থেকে নোট সরিয়ে নিজেদের পোশাকের ভেতর লুকিয়ে ফেলত। শুধু তাই নয়, টাকার বান্ডিল গোনার সময় বাড়তি নোট ঢুকিয়ে দিয়ে পরে তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার মতো অভিনব পদ্ধতিও তারা ব্যবহার করছিল।
প্রকাশ্য সিসিটিভি-কে ফাঁকি দিলেও, ট্রাস্টের পাতা গোপন ক্যামেরার ফাঁদে পুরোপুরি বন্দি হয়ে যায় তাদের এই কুকীর্তি। এসআইটি (SIT) সূত্রে খবর, মাত্র ৪২ দিনের ফুটেজেই অন্তত ৭১ বার টাকা হাতানোর প্রমাণ মিলেছে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এবং পুলিশের কাছে এফআইআর (FIR) দায়ের হতেই নৈতিক দায় স্বীকার করে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দেন চম্পত। গত সোমবার পুলিশ তাঁকে প্রায় ৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে চম্পত স্পষ্ট ভাবে বলেন, ‘অনুদানের টাকা চুরির পিছনে আমার কোনও ভূমিকা ছিল না। খবর পাওয়া মাত্রই আমি সক্রিয় হই এবং আমার নির্দেশেই অভিযুক্তদের ধরা হয়েছে। তবে ভক্তদের দেওয়া টাকা ও মূল্যবান জিনিস যাতে সুরক্ষিত থাকে তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব ছিল, আমি সেই ব্যর্থতা স্বীকার করছি।’
বর্তমানে তিন্নু যাদব, তাঁর ভাইপো মণীশ যাদব, অনুকল্প মিশ্র এবং অবিনাশ শুক্লা সহ মোট ৮ জন অভিযুক্ত ১৪ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। পুলিশ ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ৭৯.৮০ লক্ষ টাকা উদ্ধার করেছে এবং অবিনাশ শুক্লা নামের এক কর্মীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে ৫ লক্ষ টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ গোবিন্দদেব গিরি এক বিবৃতিতে ভক্তদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, ভক্তদের দেওয়া সোনা, রুপোর ইট ও অন্যান্য গহনা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রয়েছে এবং তার যথাযথ রেকর্ড রয়েছে। সনাতন ধর্মকে কালিমালিপ্ত করার এই অপচেষ্টায় জড়িত কাউকেই রেয়াত করা হবে না এবং দোষীদের কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।