শরিকি দ্বন্দ্বের জল্পনার মাঝেই কালীঘাটে জয়া বচ্চন, মমতার সঙ্গে বৈঠকে কি ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা
eTV Bharat | ০২ জুলাই ২০২৬
কলকাতা, 2 জুলাই: বৃষ্টিভেজা বৃহস্পতিবারের বিকেল। আচমকাই কালীঘাটে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে হাজির হলেন সমাজবাদী পার্টির রাজ্যসভার সাংসদ জয়া বচ্চন। সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও'ব্রায়েন। এদিন বাংলার 'ধন্যি মেয়ে'-কে নিজেদের বাড়িতে স্বাগত জানান খোদ তৃণমূল নেত্রী। উপস্থিত ছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ইন্ডি জোটের অন্দরে যখন সমাজবাদী পার্টি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা চলছে, ঠিক সেই সময়েই এই হাইভোল্টেজ সাক্ষাৎ। আর এই বৈঠক ঘিরেই রাজ্য রাজনীতিতে এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
ছাব্বিশের ভোটে বাংলায় তৃণমূলের বড়সড় ভরাডুবি হয়েছে। কিন্তু এই হার কিছুতেই মেনে নিতে রাজি নন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উলটে প্রথম থেকেই তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি ভোট চুরির অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন। তৃণমূলের দাবি, কারচুপি করেই তাঁদের হারানো হয়েছে। সেই সংক্রান্ত একটি মামলাও বর্তমানে আদালতে চলছে। রাজ্যের এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সমাজবাদী পার্টির সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব।
ভোটের ফল প্রকাশের ঠিক কয়েক দিনের মাথাতেই তিনি খোদ কলকাতায় ছুটে আসেন। কালীঘাটের বাড়িতে গিয়ে মমতার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ দেখাও করেন তিনি। অখিলেশ যাদব সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছিলেন। সেই ছবি দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন, ইন্ডি জোটের দুই গুরুত্বপূর্ণ শরিকের মধ্যে রাজনৈতিক রসায়ন বেশ মজবুত জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু কিছুদিন যেতে না-যেতেই সেই সমীকরণে বড়সড় বদল আসে। কলকাতায় আসেন সমাজবাদী পার্টির অন্যতম বর্ষীয়ান এবং সর্বভারতীয় নেতা কিরণময় নন্দ। তিনি রীতিমতো সুর চড়িয়ে তৃণমূলের এই হারের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই কাঠগড়ায় তোলেন। অখিলেশ যাদবের অবস্থান থেকে একেবারে বিপরীত মেরুতে গিয়ে কিরণময় নন্দ বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, "মানুষ মমতাকে চায়নি, তাই তিনি হেরেছেন।" শুধু তাই নয়, অখিলেশ যাদব কেন মমতাকে সমর্থন করেছিলেন, তারও একটি নিজস্ব ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। বর্ষীয়ান এই নেতা আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন, অখিলেশের সেই সমর্থন ছিল নেহাতই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
কিরণময় নন্দের এই মন্তব্যের পরেই দুই দলের মধ্যে দূরত্ব দ্রুত বাড়তে শুরু করে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে, তবে কি 'ইন্ডিয়া'র ভিতরেই শরিকি কোন্দল শুরু হয়ে গেল ? সমাজবাদী পার্টি কি এবার তৃণমূলের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে ? এই সমস্ত যাবতীয় জল্পনা এবং টানাপোড়েনের মাঝেই বৃহস্পতিবার জয়া বচ্চনের কালীঘাট সফর তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এমনিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বচ্চন পরিবারের সম্পর্ক বরাবরই অত্যন্ত মধুর। অমিতাভ-ঘরণী জয়া বচ্চনের সঙ্গেও তৃণমূল নেত্রীর ব্যক্তিগত সমীকরণ খুব ভালো। এর আগে বাংলার ভোটের সময় তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রচারের ময়দানেও দেখা গিয়েছিল জয়াকে। তবে সে সব এখন অতীত। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি এখন জোট শরিকের প্রতিনিধি। এই অবস্থায় তাঁর আচমকা কালীঘাটে আসা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে সব মহলে।
অনেকের মতেই, কিরণময় নন্দের ওই বিতর্কিত মন্তব্যের পর দুই দলের মধ্যে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতেই হয়তো আসরে নামানো হয়েছে জয়া বচ্চনকে। অর্থাৎ, এই সফর আদতে সমাজবাদী পার্টির ড্যামেজ কন্ট্রোলের মরিয়া চেষ্টা হতে পারে। আবার অন্য একটি অংশের মতে, আগামী দিনে ইন্ডি জোটের রণকৌশল কী হবে, জোটের রূপরেখা কোন পথে এগোবে, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়ে থাকতে পারে দুই নেত্রীর মধ্যে।
তবে বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিভেজা বিকেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জয়া বচ্চনের মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঠিক কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দুই দলের তরফেই বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে।
জয়া বচ্চনের এই সফর নিছকই ব্যক্তিগত সৌজন্যমূলক, নাকি এর পিছনে ড্যামেজ কন্ট্রোল এবং আগামী দিনের গভীর কোনও রাজনৈতিক সমীকরণ লুকিয়ে রয়েছে, তা হয়তো আগামী দিনেই ক্রমশ স্পষ্ট হবে। আপাতত জয়ার এই ঝটিকা সফর ঘিরেই সরগরম বাংলার রাজনীতি।