এই সময়: তৃণমূল জমানায় পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে যে, সাধারণ মানুষ নালিশ জানালেও অনেক সময়ে তার যথাযথ তদন্ত হয় না বা অভিযোগ চেপে দেওয়া হয়। কখনও আবার পুলিশের কিছু আধিকারিকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগও উঠেছে। যে হেতু সাধারণ মানুষ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে পুলিশকেই সামনে দেখতে পান এবং যে কোনও ধরনের অভিযোগ জানাতে পুলিশেরই দ্বারস্থ হন, তাই তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে আখেরে সরকারের ভাবমূর্তিই ধাক্কা খায় বলে মনে করেন প্রশাসনের কর্তারা। পূর্ববর্তী জমানার সেই প্রবণতা বন্ধ করতে এ বার স্পষ্ট বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘ব্যাধি চেপে রাখা মানে সুস্থ থাকা নয়। তাতে রোগ বাড়ে।’ যে কোনও অভিযোগে পুলিশকে যথাযথ তদন্ত করারও নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কখনও ডেবিট কার্ড লক করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে, কখনও বা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বার্তা পাঠিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাবা বসানোর নিত্যনতুন কৌশল প্রায় প্রতিদিনই অবলম্বন করছে সাইবার প্রতারকরা। কিন্তু অ্যাকাউন্ট খালি হলে কোথায় অভিযোগ জানাবেন, সাধারণ মানুষ অনেক সময়ে তা বুঝতে পারেন না। বৃহস্পতিবার থেকে রাজ্যের অধিকাংশ থানায় চালু হয়ে গেল সাইবার হেল্প ডেস্ক। রাজ্যের ৫০০ থানায় এ দিনই চালু হলো মহিলাদের জন্য বিশেষ হেল্প ডেস্ক, যেখানে শুধুমাত্র মহিলা অফিসাররাই থাকবেন। নবান্ন সভাঘরে এই সব পরিষেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই সব হেল্পলাইনের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য রাজ্যের বিজেপি সরকার আগেই ‘আপনার সরকার আপনার পাশে’ নামে একটি সেন্ট্রাল হেল্পলাইন চালু করেছিল। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘এ বার থেকে আর যেন কোনও অভিযোগ সেন্ট্রাল হেল্পলাইনে না আসে।’ প্রশাসনিক কর্তাদের মতে, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, পুলিশের কাছে আসা বিভিন্ন অভিযোগ যেন পুলিশই সঠিক ভাবে খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করে এবং এই ব্যাপারে যেন মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরকে হস্তক্ষেপ না–করতে হয়।
অপরাধ দমনে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের তীব্র সমালোচনা করে এ দিন শুভেন্দুর সংযোজন, ‘কোনও অভিযোগ এলে লুকোনোর দরকার নেই। নথিভুক্ত করুন। এফআইআর করুন। ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যে ধরনের তথ্য বিভিন্ন ক্রাইমের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মহিলা ও শিশু সংক্রান্ত অভিযোগে যে সমস্ত তথ্য চায়, বিগত দিনে রাজ্যের সরকার তা পাঠায়নি। আমরা যেন এ বার কোনও ভাবে একটা সংখ্যাও কম না পাঠাই! আমরা যদি বুঝতে পারি, আমাদের রাজ্যে কোন ধরনের রোগ (অপরাধ) বেশি হচ্ছে, তা হলে আমরা সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। সেই ব্যাধিকে আড়াল করলে ব্যাধি বাড়বে।’
এ দিন নবান্ন সভাঘর থেকে রাজ্যের ৫০০ থানায় যে মহিলা হেল্প ডেস্ক পরিষেবার উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী, তা ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকবে। সেখানে প্রশিক্ষিত মহিলা পুলিশকর্মীরা মোতায়েন থাকবেন। সাইবার হেল্প ডেস্কও দিনরাত খোলা থাকবে। যে কোনও সাইবার প্রতারণার ক্ষেত্রে যত দ্রুত জাতীয় সাইবার অপরাধ পোর্টালে অপরাধ নথিভুক্ত হবে, প্রতারণার টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা ততটাই বাড়ে। পুলিশি পরিভাষায় যাকে বলে ‘গোল্ডেন আওয়ার’। বৃহস্পতিবার রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ভুক্তভোগী বা প্রতারিতের সঙ্গে ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টালের সমন্বয়ের কাজ করবে এই বিশেষ হেল্প ডেস্ক।’ সিদ্ধিনাথ জানান, ২০২২–এই কেন্দ্রীয় সরকার থানায় থানায় মহিলা হেল্প ডেস্ক তৈরির জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে সেই প্রকল্প রূপায়িত হয়নি বলে অভিযোগ।
নারী সুরক্ষার জন্য ‘দুর্গা সুরক্ষা বাহিনী’ও যাত্রা শুরু করেছে বৃহস্পতিবার। বিভিন্ন এলাকায় মহিলাদের উপরে অপরাধ ঠেকাতে এই বাহিনীর সদস্যেরা মোটরবাইকে টহল দেবেন। প্রথম দফায় ২১৩টি মোটরসাইকেল বরাদ্দ করা হয়েছে মহিলা পুলিশকর্মীদের জন্য। ধাপে ধাপে এই সংখ্যা বাড়ানো হবে। পুলিশের পরিকাঠামো উন্নয়নের পদক্ষেপ হিসেবে কলকাতা সংলগ্ন পুলিশ জেলাগুলিতে লাইভ অডিয়ো-ভিডিয়ো সম্প্রচারের ২০টি যন্ত্র এবং ক্যামেরা বরাদ্দ করা হয়েছে এ দিন। কলকাতা পুলিশ দীর্ঘ দিন ধরে এই যন্ত্র ব্যবহার করছে। কোনও বড় মিছিল, আইন–শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সমস্যায় লাইভ সম্প্রচার দেখা যাবে পুলিশের কন্ট্রোল রুম থেকে। ফলে লাইভ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন পুলিশকর্তারা।
বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশি তৎপরতা আরও বাড়ানোর পক্ষেও জোরালো সওয়াল করেন শুভেন্দু। অনেক ক্ষেত্রে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যেখানে পুলিশকে ‘অন দ্য স্পষ্ট’ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ডিজিপিকে বলেছি ১১২ পরিষেবা (সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি হেল্পলাইন) আমাদের রাজ্যে চালু করুন। গুজরাট, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশে গড়ে ৬ মিনিটে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পশ্চিমবঙ্গে সেই সময় ৩ ঘণ্টা। আপাতত আমরা থানা পিছু একটি করে গাড়ি দিচ্ছি। আগামী বাজেটে আরও গাড়ি দেওয়া হবে। তখন অন্য রাজ্য যদি ৬ মিনিটে পৌঁছয়, আমরা ৫ মিনিটে পৌঁছতে পারব, এটাই আমাদের লক্ষ্য থাকা উচিত।’