• গরম চা গলায় ঢালতেই জোড়া বিপত্তি, রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্রের মৃত্যুতে যা বলছেন চিকিৎসকেরা
    এই সময় | ০৩ জুলাই ২০২৬
  • অনির্বাণ ঘোষ

    খাদ্যনালীতে প্রবল রক্তক্ষরণ। আর খাদ্যনালী ও শ্বাসনালীর সংযোগস্থল ফুলে যাওয়া বা ল্যারিঞ্জিয়াল ইডিমা। একযোগে এই দুই প্রবল আঘাত ও প্রদাহই নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দীপ্তাংশু মাহাতোর মঙ্গলবার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁদের আক্ষেপ, যথাযথ চিকিৎসায় এতটা দেরি না হলে হয়তো এড়ানো যেতে পারত এই অকালমৃত্যু। যদিও সকলেরই অপেক্ষা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য।

    অসাবধানতায় আচমকা মুখে গরম জল কিংবা দুধ বা চা ঢেলে ফেলার নজির একেবারেই বিরল নয়। বরং সহ্যের অতিরিক্ত গরম পানীয় খেয়ে মুখ, জিভ, গাল, এমনকী গলা পুড়ে যাওয়ার নজিরও প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু সকলকে ভাবাচ্ছে একটাই কথা— সেই একই ঘটনায় কি কারও মৃত্যু হতে পারে! হতে যে পারে, তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত দীপ্তাংশুর ঘটনা। নরেন্দ্রপুরের ওই স্কুল সূত্রের খবর, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ওই ছাত্র ফ্লাস্ক থেকে আলগোছে চা খেতে গিয়েই বিপত্তি বাঁধিয়ে বসে। চা অস্বাভাবিক গরম বুঝেও তা মেঝে নোংরা হওয়ার ভয়ে ফেলে না দিয়ে গিলে নেয়। আর তাতেই খাদ্যনালী ও শ্বাসনালীর ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে যায় বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। মৃত্যুর আগে সে রক্তবমিও করে বলে জানা গিয়েছে।

    সূত্রের খবর, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের মনে হয়েছে, খুব গরম চা খেয়ে পুড়ে যায় দীপ্তাংশুর খাদ্যনালী ও শ্বাসনালীর সংযোগস্থল ল্যারিঙ্গ। ধীরে ধীরে প্রদাহ বাড়তে থাকায় সেখানে ইডিমা জন্মায় যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আকারে বড় হতে থাকে। এবং একসময়ে তা শ্বাসনালীর পথ আটকে দেয়। তার জেরেই আচমকা রেসপিরেটরি ফেলিয়োর হয় বলে মনে করছেন ফরেন্সিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তবে আরও একটি আশঙ্কাও তাঁরা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। সেটি হলো, গরম চায়ের জেরে খাদ্যনালী এতটাই প্রদাহের শিকার হয় যে খাদ্যনালীর রক্তবাহিকা 'রাপচার' হয়ে গিয়ে শুরু হয়ে যায় অবিরত রক্তক্ষরণ।

    শহরের একটি মেডিক্যাল কলেজের ফরেন্সিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কথায়, 'ওই রাপচার দু'ভাবে মৃত্যু ত্বরাণ্বিত করতে পারে।' তিনি জানান, প্রথমত, শরীরের ভিতরে রক্তক্ষরণ এতটাই বেশি হয়েছিল যে কয়েক ঘণ্টার মাথায় দীপ্তাংশু হয়তো হাইপোভোলামিক শকে চলে গিয়েছিল। আর দ্বিতীয়ত, খাদ্যনালীর সেই রক্ত মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। এবং সেই রক্তবমির কিছুটা অংশ হয়তো ওর শ্বাসনালী বেয়ে ফুসফুসে ঢুকে যায়। তার ফলেই রেসপিরেটরি ফেলিয়োর হয়ে একসময়ে মারা যায় সে।' পুলিশ সূত্রে খবর, দীপ্তাংশুর ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা ছিল কাঁটাপুকুর মর্গে। কিন্তু জটিল কেস বলে শেষ পর্যন্ত ময়নাতদন্ত হয় এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে।

    রক্তবমির অন্য কারণও উঠে আসছে চিকিৎসকদের ব্যাখ্যায়। বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সোমনাথ দাস বলেন, 'রক্তবমির নেপথ্যে পুরোনো কোনও অসুখও থাকতে পারে। যেমন পেপটিক আলসার। গরম চা সেখান থেকেই রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। যা হয়তো মুখ দিয়ে উঠে এসেছে। এবং সেই রক্তের কিছুটা অংশ শ্বাসনালীতে চলে গিয়ে চোকিং–ও হতে পারে।' সরাসরি গরম চায়ের কারণে চোকিংয়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তিনি।

    তবে চা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর এতটা সময় নষ্ট না হলে হয়তো এই প্রাণহানি এড়ানো যেতে পারত বলে মনে করছেন ইমার্জেন্সি মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তমরীশ কোলে। তিনি বলেন, 'তাপজনিত শ্বাসনালীর আঘাতে এয়ার–ওয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম হলেও, একেবারে নেই, তা নয়। কারণ মুখে পোড়ার দাগ কম থাকলে বা না থাকলেও, গলার ভিতরের অংশে আঘাত লেগে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফোলাভাব বাড়তে পারে। ফলে শুরুতে রোগী স্বাভাবিক মনে হলেও পরে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি ছিল।'

  • Link to this news (এই সময়)