• ক্রোয়েশিয়া কি বঞ্চনার শিকার? কেন VAR বাতিল করল শেষ মুহূর্তের সেই নাটকীয় সমতাসূচক গোল?
    এই সময় | ০৩ জুলাই ২০২৬
  • ক্রোয়েশিয়ার (Croatia) সমর্থকেরা তখন উৎসবে মেতেছিলেন, খেলোয়াড়দের চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। জসকো গভার্দিওলের (Josko Gvardiol) গোলে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, অসম্ভবকে সম্ভব করে ম্যাচে ফিরেছে তাদের দল। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও সবচেয়ে বড় আনন্দকেও কয়েক মুহূর্তে বিষাদে বদলে দেয়। VAR-এর দীর্ঘ পর্যালোচনার পর বাতিল হয়ে যায় সেই গোল। আর তাতেই ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) থেকে বিদায় নিতে হয় ক্রোয়েশিয়াকে, শেষ ১৬-তে উঠে যায় পর্তুগাল (Portugal)। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর গ্যালারিতে শুরু হয় তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকেরা মাঠে বোতল ও ক্যান ছুড়ে নিজেদের হতাশা প্রকাশ করেন।

    রোনাল্দোর জবাব, রামোসের আঘাতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয় পর্তুগাল

    ম্যাচে শুরুতে এগিয়ে গিয়েছিল ক্রোয়েশিয়াই। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ইভান পেরিশিচের (Ivan Perisic) গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও অনেকটাই নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ক্রোয়েশিয়া। তবে পর্তুগাল হাল ছাড়েনি। ৬৮তম মিনিটে VAR-এর সাহায্যে পেনাল্টি পায় তারা। স্পটকিক থেকে গোল করে সমতা ফেরান ক্রিস্তিয়ানো রোনাল্দো (Cristiano Ronaldo)। ৬টি বিশ্বকাপ খেলার পর নকআউট পর্বে এটিই ছিল তাঁর প্রথম গোল, যা ম্যাচের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

    ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখন সাহসী সিদ্ধান্ত নেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ় (Roberto Martinez)। তিনি রোনাল্দোকে তুলে মাঠে নামান রুবেন নেভেসকে (Ruben Neves)। অনেকের কাছে সিদ্ধান্তটি বিস্ময়কর মনে হলেও শেষ পর্যন্ত সেটিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে রাফায়েল লেয়াও (Rafael Leao) বাঁ-দিক থেকে দুর্দান্ত একটি ক্রস বাড়ান। সেই বল হেড করে জালে জড়ান গনসালো রামোস (Goncalo Ramos)। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পর্তুগাল শিবির। এক সময় যারা বিদায়ের মুখে ছিল, তারাই তখন জয় থেকে কয়েক মিনিট দূরে।

    কেন বাতিল হলো ক্রোয়েশিয়ার সমতাসূচক গোল?

    নাটকের সবচেয়ে বড় দৃশ্যটি আসে ম্যাচের ১০৩তম মিনিটে। মরিয়া হয়ে আক্রমণে ওঠা ক্রোয়েশিয়া অবশেষে একটি গোলও করে তারা। পেরিশিচের বিপজ্জনক ক্রস থেকে বল জালে জড়িয়ে দেন গভার্দিওল। সহকারী রেফারি পতাকা তোলেননি, ফলে সবাই ধরে নিয়েছিল গোলটি বৈধ। ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়রা উদযাপন শুরু করেন, সমর্থকেরাও আনন্দে মেতে ওঠেন। কিন্তু ঠিক তখনই VAR গোলটি পরীক্ষা করতে শুরু করে।

    পর্যালোচনায় দেখা যায়, পেরিশিচের ক্রসটি মারিও পাশালিচের (Mario Pasalic) কাছে পৌঁছানোর আগে ইগর মাতানোভিচ (Igor Matanovic) খুব সামান্য স্পর্শ করেছিলেন। টেলিভিশনের রিপ্লেতে সেই স্পর্শ প্রায় চোখেই পড়ছিল না। কিন্তু ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী সেই স্পর্শই পুরো সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। মাতানোভিচ বল ছোঁয়ার মুহূর্তে পাশালিচ অফসাইড অবস্থানে ছিলেন। এর পর পাশালিচ বল বাড়ান গভার্দিওলের দিকে এবং সেখান থেকেই গোলটি আসে। ফলে আক্রমণের সূচনাতেই অফসাইডের অপরাধ হয়ে যাওয়ায় গোল বাতিল করা ছাড়া রেফারির আর কোনও উপায় ছিল না। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়রা। তারা রেফারিকে ঘিরে প্রতিবাদ জানান। টেলিভিশনের অনেক দর্শকও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, কারণ রিপ্লেতে মাতানোভিচের স্পর্শ স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ছিল না।

    স্মার্ট বল প্রযুক্তিই বদলে দিল ম্যাচের ভাগ্য

    এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বিশ্বকাপে ব্যবহৃত নতুন প্রযুক্তির অ্যাডিডাস ট্রিওন্ডা (Adidas TRIONDA) ম্যাচ বল। এই বলের ভেতরে বিশেষ মোশন সেন্সর বসানো রয়েছে, যা ম্যাচ চলাকালীন বলে হওয়া প্রতিটি স্পর্শ তাৎক্ষণিক ভাবে রেকর্ড করে। খালি চোখে বা সাধারণ টেলিভিশন রিপ্লেতে যা বোঝা কঠিন, সেই স্পর্শও এই প্রযুক্তি শনাক্ত করতে পারে।

    VAR পর্যালোচনার সময় সেন্সরের তথ্য নিশ্চিত করে যে মাতানোভিচ সত্যিই বলটিতে স্পর্শ করেছিলেন। এর পর সেই তথ্য সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। তাতে স্পষ্ট হয়, মাতানোভিচ বল ছোঁয়ার মুহূর্তে পাশালিচ দ্বিতীয় শেষ ডিফেন্ডারের সামনে ছিলেন এবং অফসাইড অবস্থানে ছিলেন।

    অনেকে এই প্রযুক্তিকে ক্রিকেটের ‘স্নিকোমিটার’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে দুই প্রযুক্তির কাজ ভিন্ন। স্নিকোমিটার শব্দের সাহায্যে স্পর্শ শনাক্ত করে, আর বিশ্বকাপের স্মার্ট বল ভেতরের সেন্সরের মাধ্যমে বলের গতির সূক্ষ্ম পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে স্পর্শ ধরতে পারে।

    প্রযুক্তির সাহায্যে হয়তো আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে এমন সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নতুন বিতর্কও তৈরি করছে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এ বার ক্রোয়েশিয়া। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তারা ভেবেছিল বিশ্বকাপে তাদের স্বপ্ন বেঁচে আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক ক্ষীণ স্পর্শ,VAR-এর দীর্ঘ পর্যালোচনা এবং প্রযুক্তির নির্মম রায়ে শেষ হয়ে যায় তাদের বিশ্বকাপ অভিযান।
  • Link to this news (এই সময়)