• কয়েক বছর আগের ফাঁকা মাঠে আজ ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গল, 'সবুজ বাঁধ' তৈরি করল সুন্দরবনের তরুণ তুর্কিরা
    News18 বাংলা | ০৩ জুলাই ২০২৬
  • একদিনে হয়নি, তবে একদিন ঠিকই হয়েছে! কয়েক বছর আগের ফাঁকা মাঠ আজ ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার সন্দেশখালির আতাপুর-মনিপুর এলাকার একদল তরুণ সবুজ বিপ্লব ঘটালেন! যেখানে দিকে-দিকে সবুজ ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে মানুষ, সেখানে সবুজকে নতুনভাবে জন্ম দিতে বদ্ধপরিকর অনির্বাণ, অনয়, দেবকান্ত, নীলোৎপল-রা।

    রায়মঙ্গলের পাড়ে স্থানীয় যুবকদের অনন্য পদক্ষেপে ফাঁকা ম্যানগ্রোভহীন এলাকা আজ ঘন জঙ্গল। সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা ও নদীবাঁধ সুরক্ষায় এ এক অনন্য নজির! এক সময় রায়মঙ্গল নদীর খাড়ি সংলগ্ন মিঠাখালির বিস্তীর্ণ বাঁধ এলাকা ছিল প্রায় ম্যানগ্রোভহীন। আজ সেই এলাকায় কয়েক লক্ষ ম্যানগ্রোভ, তৈরি হয়েছে ছোট্ট এক জঙ্গল।

    শুরুর গল্প

    তবে গোড়া থেকেই বলা যাক! সন্দেশখালির ১৮ জন যুবক এই ‘সবুজ স্বপ্ন’ দেখেছিলেন। ছিলেন অনির্বাণ দাস, অনয় মণ্ডল, দেবকান্ত মান্না, সুশান্ত বার, নীলোৎপল মণ্ডল, পূর্ণেন্দু দাস, তমালকান্তি ঘোড়ই, অজয় কুমার দাস, বিশ্বজিৎ দাস, আদিত্য নায়েক, শোভন খাটুয়া, রণজিৎ ঘোড়ই, শুভময় দাস, অনুভব মান্না, কমলেশ মান্না, রূপকুমার প্রামাণিক, জয়ন্ত সর্দার, রূপম দাস। সবার বয়স ২৫-৩৫-এর মধ্যে। প্রত্যেকেই স্বাবলম্বী এবং আলাদা আলাদা পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবু তাঁদের মনে ছিল সবুজ বোনার স্বপ্ন! পাশে দাঁড়ায় স্বপন সুঁই-এর নেতৃত্বে ‘সুখের স্বর্গ ফাউন্ডেশন’ এনজিও।

    এই এনজিও-র মাধ্যমে একটি স্কুল তৈরি করা হয়, যার নাম ‘সাফল্য একাডেমি’। তরুণদের এই দলের প্রায় প্রত্যেকেই এই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতার পারিশ্রমিক বাবদ মাসে ২,০০০ টাকা করে পান তাঁরা। এর পাশাপাশি কেউ ভ্যান চালান, আবার কেউ চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত। রোজের  রুটি-রুজির কঠিন লড়াই সামলেও পরিবেশ রক্ষায় বাকি সময়টুকু উজাড় করে দেন কমলেশ, জয়ন্তরা।

    ফান্ডিং

    কোনও একটা বিশেষ ঋতু নয়, আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী গোটা বছরই চলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। কিন্তু ফান্ডিং কোথা থেকে আসে? এনজিও-র উদ্যোক্তা স্বপন সুঁই জানান, ” এই উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখতে এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার সিএসআর (CSR) ফান্ড, সহৃদয় ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত অনুদান এবং বিভিন্ন এনজিও (NGO)-র সহযোগিতা আমাদের মূল ভরসা।”

    রায়মঙ্গল নদীর পাড়ে এখনও পর্যন্ত ১০০ একরেরও বেশি জমিতে সফলভাবে ম্যানগ্রোভ রোপণ করা হয়েছে। সুন্দরবনের মাটির প্রকৃতি ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখে মূলত বাইন, গর্জন, সুন্দরী এবং কেওড়া, এই ৪ ধরনের গাছ রোপণ করা হয়েছে।

    কোন ভাবনা থেকে এই প্রকল্পর শুরু

    সংগঠনের উদ্যোক্তা স্বপন সুঁই জানান, ” এই প্রকল্প আমার মস্তিষ্কপ্রসূত। আমি নিজে সুন্দরবনের এই উপকূলবর্তী এলাকার সন্তান। ২০০৯ সালের ভয়াবহ ‘আয়েলা’ ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব আমি নিজের চোখে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল, বিঘার পর বিঘা চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকে চাষাবাস পুরো ধ্বংস হয়ে গেল। মানুষ রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ধ্বংসলীলার মাঝেই আমি একটা মস্ত বড় জিনিস খেয়াল করেছিলাম—নদীর যে-সব বাঁধে বা পাড়ে ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য ছিল, সেখানকার নদীবাঁধ কিন্তু ভাঙেনি, সেই এলাকাগুলো অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল।”

    স্বপন সেইদিন মনে প্রাণে উপলব্ধি করেছিলেন, ” প্রতি বছর ঝড়ের পর দুর্গত মানুষের হাতে কিছু  ত্রাণ তুলে দিয়ে তাঁদের জীবনের স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কংক্রিটের নদীবাঁধ তৈরি করাও সম্ভব না। তাই ভাবলাম, যদি নদীর পাড় ধরে একটা ‘সবুজ বাঁধ’ তৈরি করতে পারি, তবে এই গাছগুলোই প্রাকৃতিক প্রাচীর হয়ে মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখবে এবং মাটির তৈরি আসল বাঁধ রক্ষা করবে। প্রকৃতির এই ‘জ্যান্ত রক্ষাকবচ’ ফিরিয়ে আনার তাগিদ এবং পরিবেশের বৃত্তাকার ভারসাম্য বজায় রাখার ভাবনা থেকেই ‘ম্যানগ্রোভ বাঁচাও প্রকল্প’-র সূচনা করি।”

    কী কী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে?

    স্বপন সুঁই বলেন, কাজ করতে গিয়ে বহু কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রথমেই রয়েছে বন্যপ্রাণের বিপদ, বাঘর ভয়। সুন্দরবনের গভীর খাঁড়ি ও নদীপাড়গুলোতে কাজ করার সময় সবচেয়ে বড় আতঙ্ক বন্যপ্রাণী। বেশ কয়েকবার কাজ করতে গিয়ে আমাদের আক্ষরিক অর্থেই বাঘের মুখোমুখি পড়তে হয়েছিল। এই চরম প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই আমাদের ছেলেরা কাজ করে চলেছেন। পাশাপাশি, জোয়ার-ভাটার সময় হিসেব করে বুক সমান কাদা-জল মাড়িয়ে আমাদের চারা রোপণ করতে হয়। অনেক সময় চারা লাগানোর পরেই বড় ঝড় বা তীব্র জলোচ্ছ্বাসে নতুন চারা ধুয়ে মুছে যায়।

    শুরুতে নদী তীরবর্তী সাধারণ মানুষকে এই কাজের গুরুত্ব বোঝানো এবং চারা গাছগুলোকে চরে চড়ে বেড়ানো গবাদি পশুর হাত থেকে বাঁচানো একটা বড় যুদ্ধ ছিল। এত বড় পরিসরে সারা বছর কাজ চালাতে গেলে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, শুরুর দিকে সেই স্থায়ী ফান্ডের-ও বেশ অভাব ছিল।

    আগামীর লক্ষ্য কী?

    উদ্যোক্তা জানান, ” আমাদের কাছে শুধু বড় বড় সংখ্যা বা খাতা-কলমের টার্গেট বড় কথা নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হল, সবচেয়ে কম খরচে, সুন্দরবনের যে-যে এলাকায় সবচেয়ে বেশি নদীর বাঁধ ভেঙে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেই ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে প্রচুর ম্যানগ্রোভ রোপণ করা, যাতে কম খরচে নদীর বাঁধগুলো রক্ষা করা যায়, নদী যাতে মানুষের ঘরবাড়ি গ্রাস না করতে পারে।

    পরিকল্পিত এলাকা: রায়মঙ্গলের পাড় সংলগ্ন আরও যেসব ভাঙনপ্রবণ এলাকা রয়েছে, তার পাশাপাশি সন্দেশখালি, হিঙ্গলগঞ্জ এবং সুন্দরবনের অন্যান্য অতি-সংবেদনশীল উপকূলবর্তী নদীবাঁধগুলোতে আগামিদিনে ম্যানগ্রোভ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।

    ম্যানগ্রোভ গাছগুলির যত্নের জন্য কী কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে?

    উদ্যোক্তা স্বপন সুঁই জানান,  শুধু চারা রোপণ করলেই তো হয় না, তাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই আসল কাজ। তাই গাছগুলোর যত্নের জন্য কিছু বিশেষ পদক্ষেপ করা হয়েছে–

    নিয়মিত নজরদারি: ১৫ জনেরও বেশি যুবকের দল পালা করে নিয়মিত নজরদারি চালায়।

    সুরক্ষা বেষ্টনী: জোয়ারের জলের ধাক্কা বা গবাদি পশুর মুখ থেকে বাঁচাতে চারাগাছগুলোর চারপাশে প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁশের খুঁটি ও জালের বেড়া বা ফেন্সিং-এর ব্যবস্থা করা হয়।

    স্থানীয়দের অংশগ্রহণ: নদীপাড়ের স্থানীয় বাসিন্দা, বিশেষ করে মা-বোনেদের এই রক্ষণাবেক্ষণের কাজে সামিল করা হয়েছে, যাতে তাঁরা গাছগুলোকে নিজেদের সন্তানের মতো আগলে রাখতে পারেন।
  • Link to this news (News18 বাংলা)