দালালের দিন শেষ: এবার বিনামূল্যেই মিলবে জমির খতিয়ান ও দাগের তথ্য, বড় ঘোষণা শুভেন্দুর
দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৪ জুলাই ২০২৬
আমজনতা থেকে শুরু করে রাজ্যের প্রান্তিক চাষি, সকলের সুবিধার্থে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের ঘোষণা করল নবান্ন। এবার থেকে জমির খতিয়ান (Record-of-Rights) এবং দাগের তথ্য বা প্লট ইনফরমেশন (Plot Information) পাওয়ার জন্য নাগরিকদের আর একটি পয়সাও খরচ করতে হবে না। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনলাইনের মাধ্যমে ডাউনলোড করা যাবে ডিজিটালি স্বাক্ষরিত (Digitally Signed) জমির এই সমস্ত অতিপ্রয়োজনীয় নথিপত্র।
শুক্রবার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (X) একটি পোস্ট করেও বিষয়টি জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। রাজ্য সরকারের এই জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপের ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের আর্থিক বোঝা লাঘব হবে, তেমনই অন্য দিকে সরকারি দফতরগুলিতে ‘দালাল রাজের’ দাপট এবং হয়রানি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এ দিন এক্স হ্যান্ডেলে সরকারি বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, নাগরিক পরিষেবা যাতে স্বচ্ছ, ঝামেলামুক্ত এবং অনায়াসে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে আমাদের সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
একই সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের ফি কাঠামোর দিকে আঙুল তুলে শুভেন্দু অধিকারী যোগ করেন, আজ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, খতিয়ান এবং জমির দাগের তথ্য পাওয়ার জন্য পূর্ববর্তী সরকার যে অ্যাপ্লিকেশন ফি বা অনুসন্ধান ফি (Enquiry charges) আদায় করত, তা আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে মকুব করেছি। এখন থেকে খতিয়ান ও দাগের তথ্যের ডিজিটালি স্বাক্ষরিত কপি অনলাইন থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যাবে। আপনার জমি, আপনার অধিকার, আপনার তথ্য— এখন মাত্র একটি ক্লিকের দূরত্বে।
নবান্ন সূত্রে খবর, ভূমি ও ভূমি সংস্কার এবং উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের তরফে গত ২ জুলাই একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি (Notification) জারি করা হয়েছে। ১৯৫৫ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন’-এর (West Bengal Land Reforms Act, 1955) ৫৭ নম্বর ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ‘বেঙ্গল রেকর্ডস ম্যানুয়াল, ১৯৪৩’ (Bengal Records Manual, 1943)-এর নিয়মে বড়সড় সংশোধন এনেছে রাজ্য। এই সংশোধনীর মাধ্যমে পুরনো ৩২০-এইচ (320H) এবং ৩২০-আই (320I) বিধি দুটিকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হয়েছে।
এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১৯৫৫ সালের ভূমি সংস্কার আইনের অধীনে কোনও নাগরিক যদি অনলাইনের মাধ্যমে খতিয়ানের জন্য আবেদন করেন, তবে তিনি কোনও চার্জ ছাড়াই ডিজিটালি স্বাক্ষরিত সফট কপি পেয়ে যাবেন। দলিলের পৃষ্ঠাসংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন, কোনও রকম আবেদন ফি বা প্রমাণীকরণ ফি (Authentication fee) লাগবে না। এমনকি একটিমাত্র অনলাইন আবেদনের মাধ্যমে একাধিক খতিয়ানের তথ্যও নিখরচায় খোঁজা যাবে।
এই বিধি অনুযায়ী, সরকারি ডেটাবেসে থাকা জমির দাগের তথ্যের (Plot Information) ডিজিটালি স্বাক্ষরিত সফট কপিও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হবে। অর্থ দফতরের (Finance Department) সবুজ সংকেত মেলার পরেই এই ঐতিহাসিক নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে রাজ্যজুড়ে কার্যকর হয়ে গিয়েছে ।
রাজ্য সরকারের এই বিজ্ঞপ্তিতে একটি বিষয়ে অবশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফি মকুবের এই বিশেষ ছাড়টি শুধুমাত্র অনলাইনের মাধ্যমে ডাউনলোড করা ‘ডিজিটাল কপি’-র ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। কোনও নাগরিক যদি জমি কেনাবেচা, ব্যাঙ্ক লোন বা অন্য কোনও আইনি কাজের জন্য সরকারি দপ্তর থেকে প্রত্যয়িত হার্ড কপি (Certified Hard Copies) বা বেঙ্গল রেকর্ডস ম্যানুয়াল নির্দেশিত অন্য কোনও ফিজিক্যাল নথিপত্র সংগ্রহ করতে চান, তবে তার জন্য পূর্বনির্ধারিত সরকারি ফি বহাল থাকবে। অর্থাৎ, ডিজিটাল বিপ্লবের হাত ধরে
থেকে তথ্য নেওয়ার প্রক্রিয়াটিকেই সম্পূর্ণ করমুক্ত করা হলো।
প্রশাসনিক মহলের মতে, গ্রামীণ ও শহরতলির বহু মানুষ জমির ‘পর্চা’ বা খতিয়ান তুলতে গিয়ে দিনের পর দিন ব্লক ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিকের (BLRO) দফতরে চক্কর কাটতেন। অনেক সময় সাধারণ মানুষের এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠত এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্র। মোটা টাকার বিনিময়ে মিলত ডিজিটাল কপি।
নবান্নের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ঘরে বসেই মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে জমির আইনি মালিকানা যাচাই করে নেওয়া যাবে। এই পদক্ষেপ রাজ্যের কৃষি ক্ষেত্র এবং রিয়েল এস্টেট (Real Estate) সেক্টরেও এক ইতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করবে বলে আশা।