এই সময়: পাকিস্তানি জঙ্গি কম্যান্ডারের ভারতীয় স্ত্রী! তা-ও আবার হেলাফেলা করার মতো জঙ্গি নয়, ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার একেবারে উপরের দিকে থাকা জৈশ-ই-মহম্মদের শীর্ষ কম্যান্ডার আবু উবাইদার ঘরণি। যে আবু উবাইদা জৈশ প্রধান মৌলানা মাসুদ আজ়হারের ডান হাত হিসেবে কুখ্যাত।
রাজস্থান অ্যান্টি টেররিজ়ম স্কোয়াডের (এটিএস) হাতে ধৃত জয়পুরের বাসিন্দা, বছর ৩৮-এর ববিতা ধাকড় বিয়ে করেছিলেন উবাইদাকে। গত ২২ জুন জঙ্গি-যোগের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ববিতাকে। তাঁকে জেরা করতেই বেরিয়ে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো এই তথ্য। আর তার পরে নতুন করে গোয়েন্দাদের আতশকাচে চলে এসেছে ভারতের বুকে জৈশের মহিলা উইং ‘জামাত-উল-মোমিনাত’-এর সক্রিয়তা।
কেন ‘মোমিনাত’
দিল্লি বিস্ফোরণের নেপথ্যে সক্রিয় ‘ডক্টর্স মডিউল’ ধরা পড়ার পরে তদন্তকারীদের অন্যতম বড় প্রশ্ন ছিল, জৈশ-ই-মহম্মদের মহিলা উইং শিকড় ভারতে কত দূর বিস্তৃত হয়েছে? ‘ডক্টর্স মডিউল’-এর অন্যতম মাথা শাহিন সইদকে কেন্দ্র করে ‘মোমিনাত’ কী ভাবে ভারতে তার জাল বিস্তার করতে শুরু করেছিল, সে কথা আগেই জেনেছিলেন গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, এ বার তাতে যুক্ত হয়েছে ববিতার ভূমিকাও। কারণ তাঁর স্বামী উবাইদার তত্ত্বাবধানেই ‘মোমিনাত’-এর কর্মকাণ্ড চলে।
‘সাধারণ’ মেয়ে
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, জয়পুরের মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ববিতার বিয়ে হয়েছিল ২০১৭-য়। তবে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হয়ে এক মাসের মধ্যেই সে সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। তার পরে নিজের পায়ে দাঁড়াতে ভর্তি হন কম্পিউটার কোর্সে। জঙ্গি-পথে পা বাড়ানোর সেটাই শুরু। সূত্রের খবর, জেরায় ববিতা জানিয়েছেন, জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের মতো বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল বরাবরই। তাই এ সব নিয়ে অনলাইনে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেন। তা করতে করতেই ৩০০-র উপরে সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে তাঁর যোগদান এবং শেষ পর্যন্ত কয়েক জনের সঙ্গে মোবাইল নম্বর দেওয়া-নেওয়া। জয়পুরে ববিতার পড়শিদের বক্তব্য, অত্যন্ত লাজুক এবং নম্র হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন তিনি। বাড়ি থেকে খুব একটা বেরোতেন না কোনও দিনই। একেবারে ঘরোয়া স্বভাবের মেয়েটি কী ভাবে জঙ্গি কম্যান্ডারের স্ত্রী হয়ে গেলেন, তা প্রতিবেশীদের কাছে তাজ্জব করার মতো বিষয়।
শাদি ও ধর্ম-পরিবর্তন
জেরায় গোয়েন্দারা জেনেছেন, ববিতার ফোন নম্বর নানা পথ ঘুরে চলে যায় উবাইদার কাছে। তদন্তকারীদের অনুমান, ভারতে ‘মোমিনাত’-এর জাল ছড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েই উবাইদা যোগাযোগ করে ববিতার সঙ্গে। এই সময়েই ববিতা বিভিন্ন তথ্য পাচার করেন বলে সূত্রের খবর। ক্রমশ এই কেজো কথাবার্তা গড়ায় ঘনিষ্ঠতায়। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, রূপের জন্য ববিতাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিত মাসুদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই জঙ্গি। শেষ পর্যন্ত দু’জনের বিয়ে হয় ইসলাম মতে। নাম পাল্টে ববিতা হয়ে যান খাদিজা। গোয়েন্দারা জেনেছেন, এই বিয়ে হয়েছিল অনলাইনে।
মোমিনাত ও হানি-ট্র্যাপ
তদন্তকারীদের ধারণা, ভারতে ‘মোমিনাত’-এর জাল ছড়ানোর কাজ অত্যন্ত সক্রিয় ভাবেই করছিলেন ববিতা। এক তদন্তকারী অফিসারের কথায়, ববিতা দেশের পক্ষে ‘মেজর পোটেনশিয়াল থ্রেট’ হয়ে উঠেছিলেন। গ্রেপ্তারির আগে ফোনের সব তথ্য ডিলিট করলেও সে সব উদ্ধারের কাজ ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে। সূত্রের খবর, পাকিস্তান তো বটেই, আফগানিস্তান-সহ একাধিক দেশের কিছু ব্যক্তির নম্বর পাওয়া গিয়েছে ববিতার কন্ট্যাক্ট লিস্টে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তরুণীদের নিয়ে একটি নিজস্ব মডিউল তৈরির চেষ্টায় ছিলেন ববিতা, যাকে ‘হানি ট্র্যাপ মডিউল’ বলা যায়। দেশজুড়ে তরুণীদের একত্র করে, তাঁদের ‘গ্রুম’ করে হানি-ট্র্যাপের একটি জাল তৈরির চেষ্টা করেছিলেন ববিতা। তদন্তকারীদের বক্তব্য, মোটা টাকার বিনিময়ে এই তরুণীদের দলে টানতেন তিনি। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই ‘হানি ট্র্যাপ মডিউল’-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতের সেনাবাহিনীর খবর বের করা। তবে সে সব পুরোদস্তুর চালুর আগেই ধরা পড়ে যায় ববিতা।