প্রায় ২৬ বছর আগে ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় ‘বাড়িওয়ালি’ ছবির প্রযোজক হিসেবে বাংলা সিনেমার সঙ্গে এক বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল অনুপম খেরের। তার পর দীর্ঘ বিরতি। এর মধ্যে সময় বদলেছে। এত বছর পর আবার বাংলা ছবির প্রযোজনায় ফিরছেন তিনি। নতুন ছবি ‘শুরু থেকে শুরু’কে ঘিরে কলকাতায় এসে অভিনেতা-প্রযোজক অনুপম খের যেন ফিরে গেলেন স্মৃতির পাতায়। একই সঙ্গে জানালেন ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর আশার কথাও।
অনুপমের কথায়, ‘বাংলা ছবিতে ফেরার সিদ্ধান্ত কোনও পরিকল্পনা করে নেওয়া নয়। বরং এমন একটি গল্পের অপেক্ষায় ছিলাম, যা আমাকে সত্যিই স্পর্শ করবে।’ তাঁর মতে, ‘‘বাড়িওয়ালি’-র মতো সংবেদনশীল এবং শক্তিশালী ছবির পর আবার বাংলা সিনেমায় কাজ করতে হলে সেই মানের একটি গল্প দরকার ছিল। সেই গল্পই আমি খুঁজে পাইনি।’ পরিচালক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে প্রথমে ছবির ভাবনা, তার পর একাধিকবার চিত্রনাট্য শোনার পর তিনি এই ছবি প্রযোজনার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বিশ্বাস, একটি ভালো গল্পই দর্শকের সঙ্গে ছবির সবচেয়ে বড় যোগসূত্র তৈরি করতে পারে। বাংলা সিনেমায় ফেরার এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি যাঁর কথা মনে পড়ছে, তিনি ঋতুপর্ণ ঘোষ। অনুপমের গলায় বারবার ফিরে এসেছে আবেগের সুর। তিনি বলেন, ‘ঋতুপর্ণ শুধু অসাধারণ চলচ্চিত্রকারই ছিলেন না, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অনন্য। মুম্বইয়ে গেলে হোটেলে না উঠে আমার বাড়িতেই থাকতেন। সেই সব দিন আজও মনে পড়ে।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ঋতুপর্ণর সঙ্গে আরও একটি ছবিতে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তা আর বাস্তবায়িত হলো না। তাই আজ যখন আবার বাংলা ছবির প্রযোজনায় ফিরলাম, তখন ওঁর কথা খুব মনে পড়ছিল, ঋতুপর্ণ থাকলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন।’ অনুপমের মতে, বাংলা সিনেমার প্রতি তাঁর ভালোবাসার বড় একটি অংশ জুড়েই রয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।
কলকাতার কথা উঠতেই অনুপমের মুখে ফুটে ওঠে অন্য রকম হাসি। তিনি বলেন, ‘এই শহরের মানুষ ভালোবাসতে জানেন। সেই ভালোবাসা নিঃস্বার্থ এবং আন্তরিক। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঙালিদের কাছ থেকে যে সম্মান এবং স্নেহ পেয়েছি, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’ শুধু মানুষ নয়, কলকাতার খাবারের প্রতিও তাঁর টান সমান। ঝিঙে-পোস্ত, আলু-পোস্ত, ডাল, বেগুনভাজা— এসব খাবারের নাম নিতে গিয়েও তাঁর উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
নতুন ছবি ‘শুরু থেকে শুরু’-তে অভিনয় করছেন টোটা রায়চৌধুরী, পাওলি দাম এবং রাহুল বোস। ছবির ঘোষণা অনুষ্ঠানে টোটাও স্মরণ করেন ঋতুপর্ণ ঘোষকে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর উদ্দেশে অনুপম বলেন, ‘আপনাকে আগামী সময়ে আমার ছবিতে কাজ করতেই হবে। এমন দাপুটে অভিনেত্রীকে হাতছাড়া করতে পারব না।’ কলকাতা সফরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও দেখা করেন অভিনেতা। কথা প্রসঙ্গে কলকাতার আতিথেয়তা নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আমায় আশ্বস্ত করেছেন এই শহরে শুটিং করার জন্য আমার যা কিছু দরকার সব রকম সহযোগিতা করবেন।’ তিনি আরও জোড়েন, ‘বাংলায় সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মতো ফিল্মমেকাররা কাজ করেছেন, তাই বাংলা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সারাজীবন জুড়ে থাকতে চাই।’ অনুপম আগামীদিনে বাংলা ছবি পরিচালনা করতে চান বলেও জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘কলকাতার দর্শক অসাধারণ। দর্শকই আমাদের শিক্ষিত করে তোলেন। এখানকার যে কোনও খাবার আমার ভালো লাগে। কাল বেগুনভাজা, ডাল খেয়েছি। আজ আমিষ খাবো। আমার ডিএনএ পরীক্ষা করে পাওয়া গেছে আমি ৯৫ শতাংশ কাশ্মীরি, পাঁচ শতাংশ বাঙালি। জানি না কী ভাবে। ল্যাবরেটরির কাছেই এর উত্তর আছে।’ বাংলার প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে অভিনেতা বলেন, ‘আমি টেস্ট করে দেখেছি আমার ডিএনএ ৯৫ শতাংশ কাশ্মীরি ও ৫ শতাংশ বাঙালি।’
সাক্ষাৎকার শেষে খোশ মেজাজে নিতি বলেন ‘ আজ বেগুন ভাজা ডাল আলুপোস্তো দিয়ে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া হবে।’ ছবির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। দীর্ঘদিন পর আবার বাংলা ছবিতে কাজ করতে পেরে তিনিও খুশি। তাঁর আশা, আগামী দিনে বাংলা সিনেমায় আরও ভালো কাজ হবে এবং নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা আরও বেশি সুযোগ পাবেন নিজেদের মেধা তুলে ধরার। বাংলা সিনেমার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেন বাংলার সেই সব কিংবদন্তি শিল্পীদের, যাঁদের অবদান ছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। সত্যজিৎ রায়, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়, বিমল রায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, শচীন দেব বর্মণ, রাহুল দেব বর্মণ— একের পর এক নাম উচ্চারণ করে অনুপম খের বলেন, ভারতীয় সিনেমা বাংলার কাছে অনেক ঋণী। অভিনেতার কথায় যেন ধরা পড়ে তাঁর জীবনদর্শনও। তিনি বিশ্বাস করেন, কঠিন সময় স্থায়ী নয়। অন্ধকারের পর যেমন সকাল আসে, তেমনই প্রতিটি মানুষ চাইলে নতুন ভাবে শুরু করতে পারেন। আর সেই বিশ্বাসই যেন তাঁর নতুন বাংলা ছবির নামেও ধরা পড়েছে।