শুভাশিস সৈয়দ
চেয়ারে গম্ভীর মুখে বসে আছেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। বাইরে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। দেশের রাজনীতিতেও টানটান উত্তেজনা। জাতীয় কংগ্রেস আর ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ চলছে। এর মধ্যেই মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার প্রামাণিক বাড়িতে এসেছেন নেতাজি। কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত রয়েছেন। স্বাধীনতা আন্দোলন কোন পথে এগোবে, আলোচনা চলছে।
সব শেষে শুরু হলো খাওয়াদাওয়া। টেবিল ভর্তি করে নানা পদ সাজিয়ে দেওয়া হলো নেতাজিকে। কিছুই মুখে তোলেননি তিনি। আগ্রহের সঙ্গে যেটা খেয়েছিলেন, সেটা মনোহরা। তবে পুরোটা নয়। সেই ঘটনার কথা বাবা-কাকাদের মুখে শুনেছেন বেলডাঙার প্রামাণিক বাড়ির রূপকুমার প্রামাণিক। উজ্জ্বল মুখে বললেন, ‘মনোহরাটা অর্ধেক ভেঙে মুখে দিয়েছিলেন। বাকিটা প্রসাদের মতো সবাই ভাগাভাগি করে খান।’ গত মাসে জিআই তকমা পেয়েছে জনাইয়ের মনোহরা। বেলডাঙার মনোহরার ভাগ্যে অবশ্য শিকে ছেড়েনি। কিন্তু তার ঐতিহ্যও তো কম কিছু নয়। তা হলে?
জনাইয়ের মনোহরার প্রাণ ছানার পুর। আর বেলডাঙার মনোহরার পরিচয় তার সুগন্ধি ক্ষীরে। সঙ্গে মেশানো হয় এলাচ, কেশর, গোলাপজল বা কেওড়া, বাদাম, পেস্তা, কিসমিস। কখনও আবার শুকনো ফলও। মুর্শিদাবাদ নবাবদের শহর। তখন সেই রকমই রেওয়াজ ছিল বেলডাঙা তার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এখানকার দুধ, ছানা এবং কৃষিজ পণ্য নিয়মিত পৌঁছে যেত মুর্শিদাবাদের বাজারে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, সেই পথ ধরেই বেলডাঙার মনোহরাও পৌঁছেছিল নবাবি দরবারে।
নেপথ্যে ‘নাকু ময়রার’ হাতযশ। আসল নাম রাজগোপাল সাহা। তবে গোটা মুর্শিদাবাদ তাঁকে ‘নাকু’ নামেই চেনে। তিনিই নরম ছানার সন্দেশকে ঘন চিনির রসে ডুবিয়ে দিলেন। জন্ম নিল মনোহরা। মিষ্টিপ্রেমীদের মন জয় তো করলই, সময়কে হার মানিয়ে দিনের পর দিন নিজের স্বাদ, গন্ধ, বর্ণও অটুট রাখল। ১৯০৫-এ রানাঘাট–লালগোলা রেলপথ চালু হয়। বেলডাঙার অর্থনীতিও ডালপালা মেলতে শুরু করে। তার সঙ্গে জনপ্রিয় হতে থাকে মনোহরা। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ে বহরমপুর, লালগোলা হয়ে কৃষ্ণনগর, কলকাতা। তার পরে বিমানে বিদেশে। লোকমুখে শোনা যায়, ইংল্যান্ডেও এর সুখ্যাতি ছড়িয়েছিল।
নরম ছানার সন্দেশের গায়ে চিনির কঠিন আস্তরণ। বাইরে মচমচে, ভিতরে নরম। চিনির খোলসেই লুকিয়ে রয়েছে আস্ত বিজ্ঞান। সহজে নষ্ট হয় না। ফ্রিজে না রাখলেও মনোহরা ভালো থাকে দীর্ঘদিন। তাই রাজদরবারেও এর কদর ছিল খুব। ব্রিটিশ আমলেও সেই খ্যাতি বজায় ছিল। উনিশ শতকে বাংলায় কর্মরত ইংরেজ এবং ব্যবসায়ীরা ছানার মিষ্টি ভালোবাসতেন খুব। কিন্তু সাধারণ সন্দেশ এক-দু’দিনের বেশি টিকত না। মনোহরা হয়ে উঠল মুশকিল আসান। গোরা সাহেবদের মুখেও হাসি।
জনাইয়ের মনোহরা জিআই ট্যাগ পাওয়ার পরে মন খারাপ বেলডাঙাবাসীর। এর জন্য উদ্যোগের অভাবকেই দায়ী করছেন মিষ্টি ব্যবসায়ী সুশান্ত বিশ্বাস। তাঁর দাবি, ‘জনাইয়ের চেয়ে আমাদের মনোহরা অনেক প্রাচীন। স্বাদেও কয়েকশো গুণ এগিয়ে। কিন্তু আমরা জিআই ট্যাগ পেলাম না। এটা লজ্জার।’ ফ্রিজে না রেখে ঠিক কতদিন মনোহরা ভালো থাকে, সেই নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। সুশান্ত বলে দিলেন, ‘কোনও রাসায়নিক ব্যবহার না করে ১৮ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে।’ তিনি চান কমপক্ষে তিন মাস ভালো রাখতে।
মনোহরার উত্তরাধিকার আজও বহন করছেন বেলডাঙার তিন পুরুষের মিষ্টি ব্যবসায়ী চন্দন সাহা। তাঁর কাছে মনোহরা নিছক মিষ্টি নয়, পরিবারের ঐতিহ্য, এলাকার পরিচয়। বলে দিলেন, ‘ছানার সঙ্গে চাঁছি বা সর মিশিয়ে তাতে জায়ফল, জয়ত্রি, এলাচ গুঁড়ো দেওয়া হয়। সেই মিশ্রণ দিয়ে তৈরি করা হয় গোল মণ্ড। তার পরে তাতে ঢালা হয় গরম চিনির রস। শেষে কলাপাতা বা তেল মাখানো শালপাতার উপর রেখে প্রায় আধঘণ্টা ধরে ঠান্ডা করা হয়। জন্ম হয় বেলডাঙার মনোহরা।’ একই দাবি করেছেন বেলডাঙার সমাজকর্মী মহম্মদ নাজমে আলম ওরফে বাবিনও।
কথা বলতে বলতে তাঁর গলায় মিশে যায় অভিমানের সুরও, ‘এই স্বাদ আর গন্ধের টানেই তো আজও মানুষ বেলডাঙায় ছুটে আসেন। অথচ প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো এই মিষ্টি এখনও জিআই স্বীকৃতি পেল না।’ তিনি চান প্রশাসন এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিক। একই দাবি তুলেছেন বেলডাঙার বিধায়ক ভরত ঝাওরও। তাঁর কথায়, ‘এত বছরের ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও এখনও কেন বেলডাঙার মনোহরার জন্য কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, তা সত্যিই বিস্ময়কর। নিয়ম মেনে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য যতদূর যেতে হয়, আমি ততদূরই যাব।’
মিষ্টির স্বাদ জিভে লেগে থাকে কিছু ক্ষণ, কিন্তু তার ইতিহাস বেঁচে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সেই ইতিহাস থেকে আজ বেলডাঙাবাসী প্রশ্ন তুলছে, যে মনোহরা এতদিন ধরে মানুষের মন জিতে এসেছে, তার প্রাপ্য স্বীকৃতি কবে মিলবে?