• পিতৃপক্ষে উদ্বোধন নয়, জৌলুস হারাবে শ্রীভূমি! তৃণমূল নেতা-মন্ত্রীদের দুর্গাপুজোর ভবিষ্যৎ কী?
    প্রতিদিন | ০৪ জুলাই ২০২৬
  • কলকাতার দুর্গাপুজো বলতেই যে পুজোর নামগুলি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তার প্রথম সারিতে নিঃসন্দেহে থাকে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বোসের পুজোর জাঁকজমকে বিস্মিত হয় আট থেকে আশি। প্রায় ১৫ দিন ধরে চলে উৎসব। শুধু লেকটাউনের এই পুজো কেন, উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তৃণমূল নেতা এবং প্রাক্তন মন্ত্রীদের বহু পুজো। বিগ বাজেটের সেসব পুজো থেকে নেতা-মন্ত্রীদের আয়ও হত আকাশছোঁয়া, নিন্দুকরা অন্তত তেমনটাই দাবি করে এসেছেন এতকাল। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পর একের পর এক মন্ত্রী, কাউন্সিলারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেউ কেউ আবার ‘ডিম থেরাপি’র আশঙ্কায় জনসমক্ষে বেরনোর ঝুঁকি নিচ্ছেন না! এমন পরিস্থিতিতে জোরাল হচ্ছে একটা প্রশ্ন। তৃণমূলের হেভিয়য়েটদের পুজোর এবার ভবিষ্যৎ কী? আদৌ নামজাদা পুজোগুলিতে দেবী দুর্গার আরাধনা হবে তো? খোঁজ নিল সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল।

    পুজোর আর চার মাসও বাকি নেই। এই সময়ে শহরের নামী পুজোর বেশিরভাগেরই মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এবারের ছবিটা অনেকটাই আলাদা। অরূপ বিশ্বাসের পুজো বলে পরিচিত সুরুচি সংঘ চত্বরে এখনও পর্যন্ত কোনও পুজো পুজো গন্ধ নেই। আপাতত প্রাক্তন মন্ত্রীমশাই ব্যস্ত নিজেকে ‘আসল তৃণমূল’ প্রমাণ করতে। গড়িয়াহাট এলাকার দুই বিগ বাজেটের পুজো হিন্দুস্তান ক্লাব এবং ত্রিধারার নেপথ্যেও দুই প্রাক্তন বিধায়ক চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং দেবাশিস কুমার। তাঁরাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাম লিখিয়েছেন ঋতব্রত শিবিরে। দেবাশিস কুমার অবশ্য বলে দিচ্ছেন, পুজোর আগে হাতে নাকি অনেকখানি সময় আছে। যেমন আয় হবে, সেভাবেই পুজোয় ব্যয় হবে! আবার পাটুলি এলাকার কেন্দুয়া শান্তি সংঘের পুজোর প্রধান উদ্যোক্তা তথা কাউন্সিলর বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্তের বর্তমান ঠিকানা পুলিশ হেফাজত। ফলে পুজোর প্রস্তুতির কোনও তোড়জোড়ই চোখে পড়ছে না। ক্লাবের তরফে যদিও বলা হচ্ছে, প্রতিবারের মতোই পুজো হবে এবারও। রাজডাঙা নব উদয় সংঘের পুজোর পৃষ্ঠপোশক সুশান্ত ঘোষও এখন পুলিশের জালে। ফলে পুজোর জাঁকজমকে ভাটা পড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

    কলকাতার পুজো কমিটিগুলির জন্য বরাবর সিদ্ধহস্ত ছিলেন প্রাক্তন মুখ্য়মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৫ সালে ক্লাব পিছু পুজোর অনুদান বাড়িয়ে করেছিলেন ১ লক্ষ ১০ হাজার। ফলে রাজ্য়ের রাজকোশের একটা বড় অর্থ চলে যেত পুজো খাতে। পুজো থেকে আয়ের পরিমাণও ছিল আকাশছোঁয়া। তবে বিরোধীরা বারবার দাবি করেছে, এই আয়ের অর্ধেকই চলে যেত নেতা-মন্ত্রীদের পকেটে। আর সেই অভিযোগ যে নেহাত মিথ্যে ছিল না, তা লেকটাউনের বাসিন্দাদের একাংশের কথাতেই স্পষ্ট। শ্রীভূমির স্পোর্টিং ক্লাবের নামে ৫০ শতাংশ অর্থ যেত সুজিত বোসের কাছে! তাই শ্রীভূমির যে চাকচিক্য দেখে অভ্যস্ত পুজোপ্রেমীরা, এবার হয়তো তা দেখা যাবে না। সাবেকী প্রতিমা, সনাতনী ধাঁচে, পাড়ার পুজোর মতো করে শ্রীভূমিকে সাজানোর পরিকল্পনা চলছে। পাশাপাশি পিতৃপক্ষে দুর্গাপুজোর উদ্বোধনেরও ঘোর বিরোধী এলাকাবাসীরা। সুজিতের অনুপস্থিতিতে শীঘ্রই নতুন কমিটি গড়ে পুজো নিয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

    শুধু শ্রীভূমি নয়, পুজো কমিটি বদলাচ্ছে একাধিক ক্লাবের। বাজেটে চলছে কাটছাঁট। এমনকী তার জন্য বদলে ফেলতে হচ্ছে শিল্পীও। যার অন্যতম উদাহরণ ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়ার পুজো। তৃণমূল কাউন্সিলর অসীম বসুর পাহাড় প্রমাণ পুজোর উচ্চতা এবার অনেকটা খাটো বলেই খবর। পুজোর মানচিত্রে সাড়া ফেলা টালাপ্রত্যয়ের পুজোও এখনও বিশ বাঁও জলে। মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু করেও পিছিয়ে আসতে হয়েছে। বেআইনি ভাবে মাঠ দখলের অভিযোগ ওঠে ক্লাবের বিরুদ্ধে। ফলে খুলে দেওয়া হয় বাঁশ, কাঠামো। শোনা যাচ্ছে, জটিলতা না কাটলে শিল্পী বদল করে সাদামাটা পুজোর পথে হাঁটতে পারে টালা প্রত্যয়। এই প্রসঙ্গেই বলে রাখা জরুরি, এই পুজোর প্রধান উদ্যোক্তার নাম জড়িয়ে ‘মাস আর্ট’ নামের পুজো প্রদর্শনীর সঙ্গে। যা ইউনেসকো স্বীকৃত বলেই এতদিন ঢাক পেটানো হয়েছিল। কিন্তু ইউনেসকোর নাম ভাঙিয়ে অর্থ তোলার কাজ করেছে ‘মাস আর্ট’, সম্প্রতি তেমনই অভিযোগ উঠেছে। ফলে টালার পুজোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠছে।

    পুজোয় এবার সব ক্লাবকে যে সরকারি অনুদান দেওয়া হবে না, তা একপ্রকার স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষও জানিয়ে দিয়েছেন, পুজো বড় করেই হোক। রাজ্যে স্পনসর আসুক। আর স্পনসর প্রসঙ্গে হাতিবাগান সর্বজনীনের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে অতীন ঘোষের দাবি, পুজো কীভাবে হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করবে ক্লাবগুলি স্পনসর পাবে কি না। তবে এসব ডামাডোলেও ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হওয়া সুদীপ পোল্লের পুজো বড়িষা ক্লাবে খুঁটিপুজো হয়েছে। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের চেতলা অগ্রণীর তরফেও জানানো হয়েছে, ধুমধাম করেই হবে দেবীর আরাধনা।

    এবার দেখার বিগ বাজেটের কোন পুজো নিজেদের জৌলুস ধরে রাখতে পারবে, আর কারা পুজোর মানচিত্রে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে অন্তত নমো নমো করেই পুজো সারে।
  • Link to this news (প্রতিদিন)