সমাজমাধ্যমে ভাইরাল যাদবপুরের বাংলা বিভাগে প্রশ্নপত্র৷ স্নাতক স্তরে ভর্তির জন্য যে প্রবেশিকা পরীক্ষা নেওয়া হয় সেখানে পুঁথিগত জ্ঞান নয়, অন্তরের অনুভূতির কথা জানতে চাওয়া হয়েছে৷ প্রতিবছরই ছাত্রছাত্রীরা সিলেবাসের বাইরের কথা লিখতে পারবে এমন সম্ভাবনাময় প্রশ্নপত্র থাকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেন এমন প্রশ্ন করা হয়? আজকাল ডট ইন-কে জানালেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দুই অধ্যাপক৷
অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিনহা বলেন, "কিছুই পড়ে আসতে হবে না কারণ আমি তোমাকে পড়াব৷ আমার শুধু দেখা প্রয়োজন তোমার নিজের ভাবার ক্ষমতা আর সেই ভাবনাকে তোমার প্রকাশ করার ক্ষমতা৷ আমি নিজে একজন চাষী পরিবারের ছেলে৷ আমার বাড়িতে গীতাঞ্জলি'ও ছিল না, কিছুই ছিল না৷ আমি কোথা থেকে পাব বই? তাই জ্ঞান নয়, একজন মানুষের মধ্যে অর্জন করার ধারণ করার ক্ষমতা কতখানি সেটাই দেখা হয়৷ সৃজনশীল চিন্তা এবং সেটাকে প্রকাশ করার ভাষিক দক্ষতা,এখানেই জোর বেশি।ক'টা জিনিস কম বা বেশি জানা,সেটা গৌণ। সমস্ত পরিবেশ পরিস্থিতির মানুষ যাতে ধারণ করতে পারে সেই কথা মাথায় রেখেই এই প্রশ্নপত্র৷"
অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিনহা আরও বলেন, "আমাদের সবসময় চেষ্টা থাকে গ্রাম থেকে শহর,উত্তর থেকে দক্ষিণ সব স্কুলের বারো ক্লাস পাস করা ছেলেমেয়েদের জগতটাকে যাতে ছোঁয়া যায়। আমরা এটা বুঝি যে শুধু কলকাতা বা শহরে থাকা ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে না৷ গ্রাম, মফস্বল পাহাড় থেকে সাগর সব জায়গার ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে যাদবপুরে৷ নানারকম পরিবেশ নানারকম পরিস্থিতিতে তাঁদের বেড়ে ওঠা, তাঁদের সংবেদনশীলতা, চিন্তা, বিবেচনাবোধ সব ভিন্ন৷ যে ধরনের পারিবারিক পরিবেশ থেকেই আসুক না কেন, প্রত্যেক মানুষের নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ আছে৷ আমাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে সকলে যেন নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে৷ শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন সব জায়গার মানুষ যাতে উত্তর লিখতে পারে সেই চেষ্টা করা হয়৷ বিশাল বুদ্ধি বা জ্ঞান দরকার আছে তেমন নয়, ভাবার ক্ষমতা আর ভাষার মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশের ক্ষমতাটাই দেখা হয়।"
অধ্যাপক জয়দীপ ঘোষ বলেন, " এই ধরনের প্রশ্নের যেটা মজা, বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পরিবেশের মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা, তাই তাদের উত্তর বিভিন্ন হবে। যিনি অনেক পড়াশোনা করেছেন তিনি একরকম লিখবেন আবার যিনি কিশোর কিশোরী তাঁর উত্তর লেখা তাঁর প্রকাশ অন্যরকম হবে৷ এই প্রশ্নের মধ্যে বহুবিচ্ছুরণের মাত্রা আছে৷ আমরা কখনওই ভাবি না সদ্য স্কুল পাশ করা ছেলেমেয়ে বিশাল বৌদ্ধিক কিছু লিখবেন৷ আমাদের যে ভর্তির পরীক্ষা হয়, সেখানে ৫০% উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর আর ৫০% অ্যাডমিশন টেস্টে পাওয়া নম্বর মিলিয়ে হয়৷ কেমন লেখাপড়া, সিলেবাস কতটা পড়েছে সেটা উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর দেখেই বুঝতে পারছি৷ সিলেবাসের পড়ার বাইরে সে কতটা ভাবতে পারে, মানুষ সমাজ প্রকৃতি সংস্কৃতি তাঁর বয়স অনুযায়ী সে কতটা সংযুক্ত সেটাই আমরা দেখার চেষ্টা করি৷ যেখানে তার ভাবনাকে আমরা জানতে পারি৷ এই ভাবনাকে সে তাঁর বয়স অনুযায়ী কতটা ভাল ভাবে সহজ ভাবে প্রকাশ করতে পারছে সেটা বুঝতে পারি৷"
অধ্যাপক জয়দীপ ঘোষ বলেন, "জীবনানন্দের কবিতায় অবসাদ এই ধরনের প্রশ্ন দেওয়া হয় না৷ কারণ সকলের প্রচুর বই পড়ার মতো সুযোগ থাকে না সবসময়। প্রশ্নে এত অপশনও সেই কারণেই দেওয়া হয় ৷ সকলেই যেন নিজের কথা কিছু অন্তত লিখতে পারে। এই যেমন গাছ কাটা হচ্ছে, পাখিদের কথোপকথন, এর জন্য প্রচুর বই পড়তে হবে না৷ হৃদয়ে সামান্য বেদনাবোধ আর প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সামান্য বোঝাপড়া থাকলেই এই উত্তর লিখতে পারবে৷ প্রতিবছরই আমরা যখন খাতা দেখি, কিছু খাতা এমন থাকে যা দেখে আমরা চমকে যাই৷ খাতা দেখা হয় চা মুড়ি খেতে খেতে আড্ডার মেজাজে৷ কেউ ভাল উত্তর লিখলে মনে হয় এ যেন আমাদেরই অ্যাচিভমেন্ট।"অধ্যাপক ছন্দম চক্রবর্তী বলেন, "আমরা দেখার চেষ্টা করি একজন ছাত্রের চিন্তা করার শক্তি৷ চারপাশের সমাজকে সে কীভাবে দেখে এবং সেই দেখাটা বাংলা ভাষার মাধ্যমে সে কীভাবে প্রকাশ করতে পারে৷ নিছক তথ্য নয়, ছাত্রের মন বোঝার চেষ্টা করা হয়৷ যেহেতু তথ্যের বাইরের লেখা তাই ছাত্রের ভাষিক দক্ষতাটাও বোঝা যায়৷ পড়াশোনার জন্য আগামী চার বছর রইল৷ কিন্তু জীবনকে সে কীভাবে দেখে সেটুকু জানতে চাই আমরা।"