আমার সংগ্রামী লগ্নে জন্ম, দলের রাশ নিজেই নিলেন হাল না ছাড়া মমতা
দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৫ জুলাই ২০২৬
দল ভাঙছে টুকরো টুকরো হয়ে, পার্টি অফিস বেদখল হয়ে গিয়েছে বিদ্রোহীদের হাতে। এমনকি নিজের বেছে দেওয়া রাজ্য সভানেত্রীও ছেড়ে চলে গিয়েছেন বিপক্ষ শিবিরে। তবু পিছু হটলেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার বিকেলে কালীঘাটের দলীয় কার্যালয় থেকে ফেসবুক লাইভে এসে নিজেই ঘোষণা করলেন, রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেসের হাল এ বার থেকে তিনি নিজেই ধরবেন।
মাত্র দু’ মাস আগে, গত ৩ জুন কালীঘাটের বৈঠকে অসুস্থ সুব্রত বক্সীর জায়গায় চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে রাজ্য সভানেত্রী করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শুক্রবার মেট্রোপলিটনের তৃণমূল কার্যালয় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা কার্যত দখল করে নেওয়ার পরে চন্দ্রিমার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দলনেত্রী। সেই ফোনালাপের পরে শনিবার তৃণমূলের সব পদ থেকে ইস্তফা দেন চন্দ্রিমা, দুপুরেই বিধানসভায় গিয়ে বৈঠক করেন ঋতব্রত-সন্দীপনদের সঙ্গে। ঠিক তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কালীঘাটের কার্যালয় থেকে ফেসবুক লাইভ করে সাংগঠনিক রদবদলের কথা জানিয়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। তাঁর কথায়, কে ছেড়ে গেল তাতে কিছু যায় আসে না, তাঁর নেতা চাই না, সাধারণ কর্মী চাই। রাজ্য সংগঠনের দায়িত্বও এ বার তিনি নিজেই সামলাবেন বলে জানিয়ে দেন তিনি। সাংগঠনিক সুবিধার জন্য দুই রাজ্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাম ঘোষণা করেন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র এবং বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষের।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ইএম বাইপাসের ধারে মেট্রোপলিটনের তৃণমূল কার্যালয়ে বড়সড় তালা ঝুলিয়ে দেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা, গেটে ঝোলে নতুন ব্যানার, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম নেই, বরং চেয়ারম্যান হিসেবে লেখা হয় হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়ের নাম। সে সময় ওই ভবনে তৎকালীন রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের থাকার কথা থাকলেও দখলদারি প্রতিরোধে তাঁকে দেখা যায়নি। খবর পেয়ে ছুটে যান কুণাল ঘোষ, মদন মিত্ররা, রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং প্রগতি ময়দান থানায় দখলদারির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করেন। ঘটনার পুরো বিবরণ শোনার পরেই চন্দ্রিমার কাছে জবাবদিহি চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আর সেই প্রশ্নেই অভিমানে সব পদ ছেড়ে দিচ্ছেন তিনি, এমনই দাবি করেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মকথাই আসলে সংগ্রামের গল্প। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই সচিত্র ভোটার কার্ডের দাবিতে মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলিতে তেরো জনের মৃত্যুর পরে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের পয়লা জানুয়ারি কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে নতুন দল গড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।আজ ৭১ বছর বয়সে এসে নিজের হাতে গড়া প্রায় তিন দশকের পুরনো দলকেই ধরে রাখার কঠিনতম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তিনি।
গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরেই তৃণমূলের অন্দরে প্রকাশ্যে আসে ভাঙনের ছবি। পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসে, খোদ ভবানীপুরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে যান সওয়া পনেরো হাজার ভোটের ব্যবধানে। বিরোধী দলনেতা পদে দলনেত্রীর পছন্দের প্রার্থীকে বাদ দিয়ে আশিজনের মধ্যে আটান্ন জন বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেছে নেয় দলের একটা বড় অংশ। এর পরে ধাপে ধাপে বিদ্রোহী শিবির নিজস্ব জাতীয় কার্যকরী কমিটি গঠন করে হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে, লোকসভাতেও ভাঙন ধরিয়ে ২৮ জন সাংসদের মধ্যে কুড়ি জন এনডিএ-শাসিত ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় (NCPI) যোগ দেন। পাল্টা চালে মমতাও নিজেকে চেয়ারপার্সন রেখে সংশোধিত জাতীয় কর্মসমিতির তালিকা আগেভাগেই পাঠিয়ে দেন নির্বাচন কমিশনে (Election Commission of India)।
দলের নাম, জোড়া ফুল প্রতীক এবং সাংগঠনিক কাঠামোর অধিকার নিয়ে দুই শিবিরের পৃথক দাবি ইতিমধ্যেই জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। আগামী ৬ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার মধ্যে দুই পক্ষকেই নিজ নিজ দাবির স্বপক্ষে নথি জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। এর মধ্যেই বিজেপি নেতা জিতেন্দ্র তিওয়ারির কটাক্ষ, রাজ্য সভাপতি খুঁজে পেতে এ বার সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া উচিত তৃণমূলের। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, একের পর এক ধাক্কা সামলেও নিজে সরাসরি সংগঠনের রাশ হাতে তুলে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দিচ্ছে, লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনওদিনই ছিলেন না। এখনও তিনি বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনীও দেবেন না।