• প্রতীক কাড়বে কমিশন? চিন্তা কালীঘাটের, মমতার বক্তব্যে পাল্টা ঋতব্রতর
    এই সময় | ০৫ জুলাই ২০২৬
  • এই সময়: ‘আসল তৃণমূল’ কারা, এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দরবারে লড়াই শুরু হয়েছে কালীঘাট শিবির ও বিদ্রোহী শিবিরের মধ্যে। নির্বাচন কমিশন যে পক্ষকে ‘আসল তৃণমূলের’ স্বীকৃতি দেবে, তাদের হাতেই জোড়াফুল প্রতীক–সহ ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামের অধিকার যাবে। আগামিকাল, সোমবার বিকেলের মধ্যে দুই শিবিরকে এ নিয়ে নথিপত্র সমেত লিখিত দাবি পেশ করতে বলেছে কমিশন। এই প্রেক্ষাপটে জোড়াফুল প্রতীক কালীঘাটের হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কাই কি শোনা গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণে?

    শনিবার বিদ্রোহী শিবিরের উদ্দেশে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শনিবার দীর্ঘ ফেসবুক–ভাষণে বলেন, ‘আপনার পক্ষে সরকার আছে বলে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করে, আপনি প্রতীক কেড়ে নিতে পারেন। যদিও আমরা জানি, প্রতীক আপনার পক্ষে যাবে না। কিন্তু ধরে নিলাম, যদি ভ্যানিশ কুমার আমাদের পার্টিকে ফিনিশ করার জন্য প্রতীক দিয়েও দেন, তাতে কী যায় আসে? প্রতীক সেটাই হয়, যেটা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেন।’ কারও নাম না–করলেও ভ্যানিশ কুমার বলতে যে মমতা দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বিঁধেছেন, সেটা স্পষ্ট বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

    ১৯৯৮–এ মমতা তৃণমূল প্রতিষ্ঠা করার পরপরই লোকসভা নির্বাচনের সম্মুখীন হয়েছিলেন। সেই সময় থেকে ঘাসের উপরে জোড়াফুল প্রতীক নিয়েই লড়াই করছে তৃণমূল। প্রায় তিন দশক আগের সেই অধ্যায় উল্লেখ করে মমতা এ দিন বলেন, ‘আমি এই প্রতীক নিয়ে ১ মাস ২২ দিনের মাথায় লড়াই করেছিলাম। তখন আমি প্রতীক কাউকে চেনাতে পারিনি। এখন দরকার হলে গলায় প্রতীক ঝুলিয়ে মানুষের কাছে যখন বেরোবো, আপনারা কি আমার কণ্ঠরোধ করতে পারবেন? অত সস্তা নয়। আমার কণ্ঠরোধ করতে হলে প্রাণে মেরে ফেলতে হবে।’

    বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, অরূপ রায়, আখরুজ্জামান–সহ বিদ্রোহী শিবিরের ১০ জন প্রতিনিধি গত বৃহস্পতিবার দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করেন। সাক্ষাৎপর্ব সেরে ঋতব্রতরা ফের দাবি করেন, তাঁরাই ‘আসল তৃণমূল’। এ দিন মমতার অভিযোগের ভিত্তিতে বিধানসভার প্রেস কর্নারে ঋতব্রত বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটি অ্যাপেক্স বডি। তার চেয়ারকে অপমান করা যায় না। হঠাৎ ঠাকুর ঘরে কে, আমি তো কলা খাইনি— এটা ওঁকে বলতে হচ্ছে কেন? নির্বাচন কমিশনের উপরে ভরসা রাখুন।’

    তৃণমূলের সংবিধান অনুযায়ী যে সময় অন্তর সাংগঠনিক নির্বাচন করতে হয়, তা করা হয়নি বলে বিদ্রোহী শিবিরের পর্যবেক্ষণ। যদিও মমতা এ দিন ফেসবুকে দাবি করেছেন, ‘যাঁরা আমার সই করা প্রতীকে জিতেছেন, তাঁরা এখন বলছেন, ২০২৩–এর পরে এই দলের নাকি কোনও অস্বিত্ব নেই! আমাদের ২০২৭–এর অক্টোবরে আবার ইলেকশন করার কথা রয়েছে। এটা ২০২২–এর প্লেনারি সভার সিদ্ধান্ত। (দলের) সংবিধান সংশোধন করে এটা বলা হয়েছে। ২০২৩–এ যদি পার্টির স্বীকৃতি শেষ হয়ে যায়, তা হলে ২০২৬–এ আপনারা ভোটে দাঁড়ালেন কী করে?’ তৃণমূলের সাংগঠনিক বৈঠক কিংবা নির্বাচন নির্দিষ্ট সময় যে অন্তর হয় না, তার পাল্টা উদাহরণ দিয়েছেন ঋতব্রত। তিনি এ দিন বলেন, ‘আমি ২০২০–তে তৃণমূলের রাজ্য কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হই। কিন্তু সেই রাজ্য কমিটির কোনও বৈঠক কখনও হয়েছে বলে আমি শুনিনি। এই রাজ্য কমিটিতে অন্য যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা কখনও বৈঠকে গিয়েছেন বলেও কেউ শোনেনি।’

    তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির একাধিকবার দাবি করেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক, বিভিন্ন পুরসভার অধিকাংশ কাউন্সিলার, ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের সদস্যরা তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন। এই কারণেই তারা ‘আসল তৃণমূল’। যদিও মমতা এ দিন ফেসবুক–ভাষণে মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষকে দলের অন্যতম সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই নিয়োগ নিয়ে ঋতব্রত বলেন, ‘অনুরোধ করব, যাঁদের নাম ঘোষণা করেছেন, ভালো করে খোঁজ নিয়ে করুন। মহিলা সভাপতি মালা রায়, যুব সভাপতি সায়নী ঘোষ অন্য দিকে গেলেন। চন্দ্রিমা পদত্যাগ করলেন। কর্মসমিতির একাধিক সদস্য পদত্যাগ করছেন। জেলা সভাপতিরা পদত্যাগ করছেন। যাঁদের নাম এ দিন ঘোষণা করেছেন, তাঁরা (অন্য) কোথাও যোগাযোগে নেই তো? খোঁজ নিন, না হলে আবার মুখ পুড়বে।’

    মমতার পাশ থেকে সরে যাঁরা বিদ্রোহী শিবিরে গিয়েছেন, তাঁদের ‘বেইমান’ বলে চিহ্নিত করেছেন কালীঘাট ‍নেতৃত্ব। মমতা নিজে এ দিন বলেন, ‘আপনারা বেইমান, গদ্দার। বিজেপির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছেন। বুকের পাটা থাকে তো যান, বিজেপিতে গিয়ে যোগদান করুন। ভাবেন কী, আমি কি মরে গিয়েছি? কর্মীরা মরে গিয়েছেন?’ বিধানসভার বিরোধী সচেতক আখরুজ্জামানের পাল্টা বক্তব্য, ‘গদ্দারি শব্দ রাজ্যে কে এনেছেন? রাজীব গান্ধী ওঁকে রাজপথ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী করেছিলেন। কংগ্রেসের বুকে ছুরি মেরে বিজেপির মদতে দল করেছিলেন। বিজেপির মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হয়েছেন। ২০১১–তে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার করে ফের কংগ্রেসের বুকে ছুরি মেরেছেন।’

    প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ের পাশাপাশি ২১ জুলাইয়ের শহিদ সভা নিয়েও দুই শিবিরের টানাপড়েন চলছে। যদিও লালবাজার কোনও পক্ষকেই ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভা করার অনুমতি দেয়নি। মমতা অবশ্য এ দিন ঘোষণা করেছেন প্রয়োজনে রিকশায় দাঁড়িয়ে ২১ জুলাইয়ের সভা তিনি করবেন। পুলিশ শেষ পর্যন্ত কী বলছে, সেই অনুযায়ী কোথায় সভা হবে, তা পরে ঘোষণা করা হবে। ঋতব্রত শিবিরও ২১ জুলাই কী ভাবে পালন করা হবে, তা পরে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে।

  • Link to this news (এই সময়)