• তুলতুলে রসগোল্লার মতো... মালদার আশাপুরের যে বেগুন GI তকমা পেল, তা চেখে দেখেছেন?
    এই সময় | ০৫ জুলাই ২০২৬
  • রবিবারের সকাল। জিরে-পাঁচফোড়নের গন্ধে ম ম করছে রান্নাঘর। টগবগ করে তেল ফুটছে। আর তাতে এক এক করে গা এলিয়ে দিচ্ছে চাকা চাকা বেগুন। কানে আসছে ছ্যাঁক ছোঁক। গন্ধ আর শব্দে জুড়িয়ে যাচ্ছে শরীর-মন। মালদা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এমনই মন জুড়িয়ে দেওয়া সুর। কৃষক মহলে খুশির হাওয়া। আশাপুরের বেগুন জিওগ্রাফিক্যাল ট্যাগ পেয়েছে। এ কী কম কথা! জেলাবাসী আক্ষরিক অর্থেই আত্মহারা। দেশের সীমানা পেরিয়ে এ বার বিদেশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা। বিদেশি মুদ্রা ঘরে আসবে। ধনধান্যে ভরে উঠবে ঘরদোর।

    আশাপুরের বেগুন সাধারণ নয় মোটেই। আর পাঁচটা সাধারণ বেগুনের চেয়ে স্বাদে, গন্ধে, বর্ণে অনেক পার্থক্য। আকারে ছোট। দেখতেও সাধারণ বেগুনের মতো লম্বা নয়, কিছুটা গোলাকার। আর রংও বেগুনি নয় মোটেই, বরং গায়ে সাদা আর সবুজ আভা খেলা করে। বছরে শুধু শীতকালেই ফলে এই বেগুন। গোটা খেত জুড়ে সবুজের হিল্লোল ওঠে।

    বাংলায় তখন গৌড় সাম্রাজ্য। আশাপুরে থাকতেন নবাবের খাজাঞ্চিরা। তাঁরাই নিজেদের জমিতে প্রথম ফলান অদ্ভুত এই বেগুন। সেই শুরু। প্রথমে ছোট করে। তার পরে খেত জুড়ে। আশাপুরের চাষি আলম শেখের কথায়, ‘প্রথমে জল দিয়ে মাটি ভেজাতে হয়। তার পরে শুকনো করে দেওয়া হয় সার। শেষে বীজ বপন।’ দুলাল হক নামে এক চাষি বলেন, ‘জিআই পাওয়ার পরে চাহিদা বেড়েছে। আগে উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতা — পর্যন্ত বিক্রি হতো। ইদানীং ভিন রাজ্যেও পাড়ি দিচ্ছে। স্বাদও অন্য রকম।’

    বেগুন বললেই, মনে ঘাই মারে লুচি-বেগুন ভাজার কথা। কিংবা শীতের রাতে বেগুন পোড়া। ঝাল আর ঝোলেই এর নাম ডাক। আশাপুরের বেগুন পোড়া একবার খেলে মুখে লেগে থাকবে আজীবন। এমনই দাবি স্থানীয় কৃষকদের। রসুন দিয়ে পোড়ালে একেবারে তুলতুলে রসগোল্লার মতো নরম। মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি উজ্জ্বল সাহা এখন থেকেই চাহিদা বাড়ার আশা করছেন। তাঁর কথায়, ‘চাষি এবং ব্যবসায়ীরা উৎসাহ পাবেন। উৎপাদন বাড়বে। লাভ হবে।’ সোজা কথায়, বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী হবে মালদায়।

    বেগুন নিয়ে পুষ্টিবিদ কী বললেন?

    ‘যার নাই কোনও গুণ, তার নাম বেগুন’। কার মাথা থেকে যে এই প্রবাদ বাক্যটি বেরিয়েছিল, কে জানে! কিন্তু বেগুনের মতো ‘গুণবতী’ যে ভূ-ভারতে নেই, তা প্রমাণ করে দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। তার যে কত গুণ পঞ্চমুখে তারই ব্যাখ্যা দিলেন পুষ্টিবিদ লোপামুদ্রা সাহা। তিনি বললেন, ‘বেগুনে প্রচুর পটাশিয়াম রয়েছে। ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে থাকে। তার ফলে ভালো থাকে হার্টও।’ গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স কম হওয়ায় সুগারও কন্ট্রোলে থাকে বলে জানালেন তিনি।

    ৯৯২ নম্বর জিআই ট্যাগে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্থান পেয়েছে এই বিশেষ জাতের বেগুন। চলতি বছরের ২৭ মার্চ চেন্নাই থেকে জারি হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত সেই জিআই শংসাপত্র। এই স্বীকৃতি অবশ্য একদিনে আসেনি। নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টা, গবেষণা এবং তথ্য-প্রমাণ পেশের সত্যি গল্প। আশাপুর বেগুনের নিজস্ব স্বাদ, গঠন, চাষপদ্ধতি এবং আশাপুরের মাটি-জল-আবহাওয়ার সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তুলে ধরতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিস্তৃত সমীক্ষা চালানো হয়। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, নথিপত্র যাচাই, কৃষকদের অভিজ্ঞতা, কৃষিবিজ্ঞানীদের মতামত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণাকে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। তার পরেই মিলেছে স্বীকৃতি।

    বেগুনের উৎপাদন বাড়াতে প্রশাসনের উদ্যোগ

    চাঁচল ১ ব্লকের আশাপুরে বেগুনের উৎপাদন বাড়াতে ইতিমধ্যে মহিলারা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকেও নানা ভাবে সামিল করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। তাঁরা গর্বিত। গর্বিত জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপুরও। সরাসরি বলে দিলেন, ‘এ বার কৃষকরা উপকৃত হবেন।’ আশাপুরা বেগুনের সাতকাহন শোনালেন উদ্যানপালন দপ্তরের উপ-অধিকর্তা সামন্ত লায়েক। তাঁর কথায়, ‘এই বেগুন কিন্তু মালদার আর কোথাও হয় না। শুধু আশাপুরেই হয়।’

    এক টুকরো মাটি, কয়েক প্রজন্মের কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম আর প্রকৃতির আশীর্বাদ — এই তিনের মিলিত ফসল আশাপুরের বেগুন। জিআই ট্যাগ তাই শুধু একটি স্বীকৃতি নয়, এই মাটির স্বাদ, কৃষকের ঘাম আর বাংলার ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার এক নতুন পরিচয়পত্র। আশাপুরের বেগুন আর শুধু মালদার নয়, বাংলার গর্ব। ‘নাই কোনও গুণ’-এর অপবাদ পেরিয়ে সে আজ জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বমানচিত্রে।

  • Link to this news (এই সময়)