আজকাল ওয়েবডেস্ক: অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ বালি মজুত রাখার অভিযোগে বীরভূমের বিতর্কিত ব্যবসায়ী নিজামউদ্দিন মণ্ডল ওরফে টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে এফআইআর করার আবেদন জানাল মহম্মদ বাজার ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর।
শনিবার বিকেলে অভিযানে নেমে আধিকারিকরা টুলু মণ্ডলের পার্কিং জোনে পাহাড়প্রমাণ বালির স্তুপ দেখতে পান। সরকারি নথি অনুযায়ী, সেখানে মোট ৩,১২,৯০৬ সিএফটি বালি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ বালি একদিনে সেখানে মজুত করা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন তদন্তকারী আধিকারিকদের একাংশ। ঘটনার পরেই মহম্মদ বাজার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর। বিষয়টি ঘিরে ফের চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বীরভূমের পাথর ও বালি ব্যবসায়ী মহলে।
জানা গিয়েছে, একসময় মহম্মদ বাজার এলাকার দোর্দণ্ড প্রতাপ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন নিজামউদ্দিন মণ্ডল ওরফে টুলু মণ্ডল। নিজের পাথর ব্যবসার পাশাপাশি বীরভূমের ছয়টি পাথর শিল্পাঞ্চলের সরকারি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বও দীর্ঘদিন তাঁর হাতেই ছিল। অভিযোগ, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকারি রাজস্বে ব্যাপক ফাঁকি দিয়ে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করা হতো।
স্থানীয় মহলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনের একাংশের নীরব মদতেই এই ব্যবসা নির্বিঘ্নে চলেছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় টুলু মণ্ডলের প্রভাব এতটাই ছিল যে রাজনৈতিক নেতা থেকে প্রশাসনের একাংশ পর্যন্ত তাঁর প্রভাববলয়ের বাইরে ছিলেন না।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে এসেছে, পূর্বতন সরকারের আমলে টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কার্যত কোনও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে সরকার পরিবর্তনের পর তাঁর হাত থেকে পাথর শিল্পাঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই সরকারি রাজস্ব আদায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায় বলে দাবি বিজেপির।
দলের বক্তব্য, বর্তমানে জেলার পাথর শিল্পাঞ্চল থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হচ্ছে, যেখানে টুলু মণ্ডলের সময়ে মাত্র ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়ত। বাকি বিপুল অঙ্কের অর্থ কোথায় যেত, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী শিবির।
অভিযোগ, শুধু পাথর শিল্প নয়, একাধিক বালিঘাট থেকেও দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালি তুলে তা জেলার বাইরে পাচার করা হতো। এমনকী পুলিশ যেসব বালিবোঝাই লরি বা ট্র্যাক্টর আটক করত, সেগুলির বালি শেষ পর্যন্ত টুলু মণ্ডলের পার্কিং জোনেই মজুত করা হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে। শনিবার ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের অভিযানে যে বিপুল পরিমাণ বালি বাজেয়াপ্ত হয়েছে, তা সেই দীর্ঘদিনের অভিযোগকেই নতুন করে উস্কে দিয়েছে।
মহম্মদ বাজার ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক আনন্দ বিশ্বাস জানান, টুলু মণ্ডলের সরকারি অনুমতি ছিল নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বালি তোলার। সেই বালি সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার করার কথা থাকলেও অভিযোগ, তা না করে রাতের অন্ধকারে ব্যক্তিগত পার্কিং জোনে মজুত করা হয়। তিনি বলেন, ওঁর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে এফআইআর করার আবেদন জানানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল। তাঁর দাবি, তিনি একজন সরকারি ঠিকাদার এবং বর্তমানে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ৫০ থেকে ৬০টি রাস্তার কাজ চলছে। সেই কাজের জন্যই পার্কিং জোনে মাটি, বালি ও কাঁকড় মজুত রাখা হয়েছিল। তাঁর কথায়, সবটাই বালি নয়, রাস্তা নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী সেখানে রয়েছে। প্রশাসন কোনও কারণ ছাড়াই তাঁর পার্কিং জোনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এর ফলে সিমেন্ট, লরি, জেসিবি-সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আটকে পড়েছে এবং রাস্তা নির্মাণের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি জানান, এই ঘটনার বিরুদ্ধে তিনি আইনি লড়াই চালাবেন।
বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলা সভাপতি উদয় শঙ্কর ব্যানার্জি বলেন, "পূর্বতন সরকারের আমলে ওই ব্যবসায়ী অনৈতিক উপায়ে ব্যবসা চালিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সেই সময় প্রশাসন সব জেনেও কার্যত চোখ বন্ধ করে ছিল। এখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ব্যবসা করতে হলে সরকারি নিয়ম মেনেই করতে হবে এবং আইন ভাঙলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।"
ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের এই পদক্ষেপের পর এখন নজর তদন্তের অগ্রগতির দিকে। বিপুল পরিমাণ বালি কীভাবে সেখানে জমা হলো, সরকারি অনুমতির শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কি না এবং এর সঙ্গে আর কারও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপই ঠিক করবে এই বহুচর্চিত মামলার ভবিষ্যৎ।