'তুমি ব্রাজিল, আমি হালান্ড', বিশ্বকাপে বড় অঘটন, নেইমারদের ছিটকে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে
আজকাল | ০৬ জুলাই ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: আর্জেন্টিনার গর্ব লিওনেল মেসি। পর্তুগালের 'সোনার ছেলে' ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। ফ্রান্সের 'রত্ন' কিলিয়ান এমবাপে। এই থ্রি মাস্কেটিয়ার্সদের সঙ্গে একই বন্ধনীতে বসতেই পারেন নরওয়ের প্রাণভোমরা আর্লিং হালান্ড।
আজকের রাতের পরে নরওয়ের মানুষ গর্ব করে বলতেই পারেন, ''আমাদেরও একজন হালান্ড আছেন।'' যিনি একাই একটা মহাশক্তিধর দেশের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিতে পারেন। যাঁর পায়ের ছোঁয়ায় জেগে উঠতে পারে একটা জাতি। সেই আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে নেইমারের চোখে এল জলের ধারা।
হালান্ডের হাসি ভীষণ ছোঁয়াচ। গ্যালারিতে তা ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রেফারির শেষ বাঁশির পরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন নেইমার। বিশ্বকাপ এমনই এক মঞ্চ। হর্ষ-বিষাদ, হাসি-কান্নার এক মহাযজ্ঞ।
মেসি, রোনাল্ডো ও নেইমার--ফুটবলের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের এবারই হয়তো শেষ বিশ্বকাপ। নেইমারকে কাঁদতে কাঁদতে চলে যেতে হল। পেলের দেশের কোচ কার্লো অ্যানচেলোত্তি সর্বহারার প্রতিভূ হয়ে বসে রইলেন ডাগআউটে। তাঁর পাশে কেউ নেই। এরকমই হয় জীবন। সাফল্যের পায়েসে ভাগ বসায় সবাই। হেরে যাওয়ার ব্যর্থতায় পাশে থাকে না কেউ। সব দায় একজনের। অ্যানচেলোত্তির চোখে শূন্যতা। কী যে হয়ে গেল হঠাৎ! বিশ্বাস করতে পারছেন না।
নরওয়ের ফুটবলে নতুন ভোর। তাদের 'সূর্য' হালান্ড মধ্যগগনে আলো-দীপ্তি-তেজ ছড়াচ্ছেন। মাঠে ড্রাম বাজাচ্ছেন আজকের নায়ক। গ্যালারিতে চলছে ভাইকিং ক্ল্যাপ। চারদিকে লাল রঙের উজ্জ্বল উপস্থিতি।
বিশ্বকাপে নরওয়ে লিখে দিল নিজেদের গৌরবগাথা। এদিনের মহাম্যাচের আগে চারবার মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও নরওয়ে। এই চার বারের সাক্ষাতে একবারও জয়ের মুখ দেখেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। নরওয়ে জিতেছিল দু'বার। বাকি দু'বার ড্রয়ের কোলে ঢলে পড়েছিল ম্যাচ।
জোড়া গোলে হালান্ড নায়ক হলে, গোটা ব্রাজিল দলটাই হয়তো খলনায়ক। শুরুতে পেনাল্টি নষ্ট করা, বড়লোকের বাউন্ডুলে ছেলের মতো গোল নষ্ট করার খেসারত দিতে হল শেষপর্যন্ত। নরওয়ের বারের নীচে তাদের দীঘল চেহারার গোলকিপার ওরিয়ান নিল্যান্ডের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ধরা দিল।
১৪ মিনিটে মাতেউস কুনিয়াকে বক্সের ভিতরে ফাউল করা হলে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে ভিনিসিয়াস জুনিয়র পেনাল্টি মারার জন্য বল তুলে দিলেন ব্রুনোর হাতে। কেন ভিনি কেন?
পেনাল্টি স্পট থেকে প্রতিপক্ষের গোললাইন পৃথিবীর রহস্যময় সরণী। সেই রাস্তায় কতজন যে পথ হারিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
এদিন সেই পথে হারিয়ে গেলেন ব্রুনো। ছুটে এসে হঠাৎ থমকে গিয়ে পেনাল্টি মারলেন তিনি। ফুটবল-দেবতা দিনটা লিখে দিয়েছিলেন নিল্যান্ডের নামেই। ব্রুনোর পেনাল্টি রুখে দিলেন তিনি।
বিশ্বকাপে (টাইব্রেকার বাদ দিলে) গত ৪০ বছরে প্রথম ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে পেনাল্টি মিস করার তিক্ত রেকর্ডও একইসঙ্গে গড়ে ফেললেন নিল্যান্ড।
চল্লিশ বছর আগের এক বিশ্বকাপ বললে নস্ট্যালিজক ফুটবলপাগলদের স্মৃতিতে ধরা দেয় ১৯৮৬-র সেই মেগাটুর্নামেন্ট।
ব্রাজিল-ফ্রান্সের সেই হৃদয়ভাঙা ম্যাচে পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নেমেই পেনাল্টি নষ্ট করেছিলেন জিকো। চার দশক পরে ব্রুনো হয়তো নিজের অজান্তেই জিকোকে মনে করিয়ে দিলেন।
সেবার পেনাল্টি শুট আউটে ফ্রান্সের কাছে হেরে গিয়েছিল ব্রাজিল। তার পর অবশ্য আমাজন দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। এবার হেক্সা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মার্কিন মুলুকে এসেছিল ব্রাজিল।
অবশ্য ছিয়াশির ব্রাজিল আর অ্যানচেলোত্তির ব্রাজিল এক নয়। এই ব্রাজিল হা-রে-রে করে আক্রমণে যায় না। এই ব্রাজিল অনেক হিসেবি। কিন্তু এই হিসেবি, অঙ্ক কষা ফুটবল খেলতে গিয়ে সাম্বার ছন্দ হারিয়ে গেল পেলের দেশের ফুটবল থেকে। হারিয়ে গেল অলঙ্কার। নষ্ট হয়ে গেল আত্মপরিচিতি।
কোথায় সেই দৃষ্টিনন্দন ফুটবল, কোথায় পাসের বিচ্ছুরণ, কোথায় গেল ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সেই ঝিলিক। এই ব্রাজিল দলে ভিনিসিয়াস জুনিয়রই অগতির গতি, অনাথের নাথ, অকুলের কুল। আর বাকিরা বিবর্ণ।
প্রথমার্ধে ভিনিসিয়াস, মাতেউস কুনিয়ারা একাধিক সুযোগ নষ্ট করেন। অবশ্য শুরুতেই ব্রাজিলের মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বইয়ে দিয়েছিল নরওয়ে।
ব্রাজিলের রক্ষণের রক্তাল্পতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৪ মিনিটেই গোল করে ফেলেছিল নিশীথ সূর্যের দেশ। কিন্তু অফসাইডের অজুহাতে সেই গোল বাতিল হয়।
অন্যদিকে ব্রুনোর পেনাল্টি বাঁচিয়ে নিল্যান্ড দলের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দিলেন বেশ কয়েকগুণ। আত্মবিশ্বাস ফিরে এল গোটা দলে। নরওয়েও সুযোগ পেলেই ব্রাজিলকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বিরতির সময় স্কোরলাইন ছিল ০-০। পরিসংখ্যান বলছে ব্রাজিল সাত বার নরওয়ের গোলে শট নিয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিলের গোল লক্ষ্য করে নরওয়ে চার বার শট নিয়েছে।
অ্যানচেলোত্তি অভিজ্ঞ কোচ। বহু বড় ম্যাচ তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্ক বের করে দিয়েছে। বিরতির পরে তিনি যে পরিবর্তন আনবেন তা জানাই ছিল। গোলের খোঁজে একের পর এক বদল আনেন ব্রাজিলের 'ম্যাকিয়াভেলি'। মাঠে নামানো হয় এনদ্রিক, নেইমার ও দানিলোকে। অ্যানচেলোত্তির পরিবর্তন প্রায় খেটে গিয়েছিল। কিন্তু শিষ্য যদি মোক্ষম সময়ে গুরুকে ডুবিয়ে দেন, তাহলে আর কী করার!
মাঝমাঠ থেকে ভিনিসিয়াস গোলের গন্ধ মাখা বল বাড়িয়েছিলেন এনদ্রিককে। কিন্তু নরওয়ে গোলকিপারকে একা পেয়েও এনদ্রিক বল বাইরে মারলেন। মাটিতে শুয়ে পড়া এনদ্রিক বিস্ফারিত চোখে হয়তো ভাবছিলেন, ''কীভাবে গোল নষ্ট করলাম আমি!''
নরওয়ে অপেক্ষার খেলা খেলছিল। অতিরিক্ত পাস খেলে খেলার গতি কমিয়ে দিচ্ছিল তারা। একবার স্ক্রিনে ফুটে ওঠা পাসের হিসেবে দেখা গেল ব্রাজিল যেখানে দুশোর সামান্য বেশি পাস খেলেছে, সেখানে নরওয়ের পাসের সংখ্যা পাঁচশো ছাড়িয়ে গিয়েছে।
নরওয়ে পাস খেলে খেলে ব্রাজিলের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করছিল। আবার হালান্ডকে উদ্দেশ্য করে নরওয়ে গোলকিপারের লম্বা বল অনেক সময়ই ব্রাজিলের রক্ষণে কম্পন ধরাচ্ছিল।
৭৯ মিনিটে অপেক্ষার অবসান ঘটান হালান্ড। এই ম্যাচের বল গড়ানোর আগে থেকে অনেকে বলছিলেন, এই লড়াই কেবল ব্রাজিল বনাম নরওয়ের নয়। এই দ্বৈরথ গ্যাব্রিয়েল বনাম হালান্ডেরও। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ এই দুই তারকার ডুয়েল অতীতে দেখেছে। তাঁদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়েছে, কথা কাটাকাটি হয়েছে। কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ।
গোল হজম করা ব্রাজিল সবসময়তেই ভয়ঙ্কর। তার উপর এমন এক সময়ে গোল খেতে হয়েছে যে ম্যাচে ফিরে আসার সময়ও নেই। নেইমারের সেই সর্পিল দৌড় আর দেখা যাচ্ছে না। বয়স তাঁর শরীরে থাবা বসিয়েছে। তার উপর চোট নেইমারের সেরাটা কেড়ে নিয়েছে। ভিনিসিয়াস জুনিয়রও বোধহয় ততক্ষণে বুঝে ফেলেছেন ছুটি হয়ে গেল এবার বিশ্বকাপ থেকে। বাকিদের মধ্যে ইচ্ছাশক্তির অভাব। আগের ম্যাচেই পিছিয়ে থেকেও জাপানকে হারিয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে জাপান আর এই নরওয়ে এক দল নয়। ম্যাচ তাদের মুঠোয়।
হালান্ড কী ভাবলেন কে জানে! আবার বিস্ফোরণ ঘটালেন তিনি। গর্জে উঠল তাঁর বাঁ পা। অ্যালিসন ভূপতিত। বল জালে। দেওয়াললিখন পড়ে ফেলেছেন সবাই। ব্রাজিল সমর্থকরা ভেঙে পড়েছেন। দেশের অসম্মান দেখে ছোট্ট এক ব্রাজিল সমর্থক কেঁদে চলেছে হাপুস নয়নে। ঠিক সেই সময়ে নরওয়ের বক্সের ভিতরে কাসিমেরোর মুখে কনুই চালানোর অপরাধে পেনাল্টি পেল ব্রাজিল।
নেইমার পেনাল্টি নিতে এগিয়ে এলেন। তাঁর সঙ্গে নিল্যান্ডের তর্ক হল। এই পড়ন্ত বেলার নেইমার নরওয়ে গোলকিপারকে বোকা বানিয়ে গোল করে গেলেন। ছুটে গিয়ে নেইমার হয়তো তাঁকে বলার চেষ্টা করলেন, ''ওহে গোলকিপার, আমি নেইমার। মনে রেখো আমার নাম।''
নেইমার গোল করলেন, ব্যবধান কমালেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। রেফারির শেষ বাঁশির পরে সেই নেইমারই জার্সিতে মুখ ঢেকে কাঁদলেন। এটাই তাঁর হয়তো শেষ বিশ্বকাপ। চলে যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু দিনের শেষে নেইমার ট্র্যাজিক নায়ক হয়েই থেকে গেলেন। দীর্ঘ কেরিয়ারে বিশ্বকাপ জেতা আর হল না তাঁর।
এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে একদিন পথচলা শুরু হয়েছিল নেইমারের। এদিন সেখানেই দৌড় শেষ হল ব্রাজিলের। হয়তো নেইমারেরও শেষ দেখে ফেলল নেইমার। শুরু আর শেষ এসে মিশে গেল একই বিন্দুতে।
স্বপ্নের দৌড় শুরু হয়েছে নরওয়ের। সমর্থকরা বলছেন, ''এই দৌড় যেন না থামে।'' মেসি-এমবাপের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন হালান্ড। এবারের বিশ্বকাপে সাতটা গোল হয়ে গেল তাঁর। মেসি-এমবাপেকে ছোঁয়ার দিন অস্ফুটে হালান্ড হয়তো বলে গেলেন, ''তুমি ব্রাজিল, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কিন্তু আমি হালান্ড।'' তিনিই ব্রাজিলের শোকের কারণ। নরওয়ের দেশনায়ক আজ আর্লিং হালান্ড।