এই সময়, হাওড়া: মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছে না। টানা ছ’মাস ধরে জলবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন হাওড়ার শিবপুর বিধানসভার ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের লিলুয়া ভট্টনগর বালক সংঘ ক্লাব সংলগ্ন আমতলা এলাকার বাসিন্দারা। হাঁটুর উপরে জমে থাকা নোংরা জল পেরিয়েই প্রতি দিনের জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কোথাও ভেলায় চড়ে, কোথাও জল ঠেলে অফিস, স্কুল কিংবা বাজারে যেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সঙ্কট দেখা দিয়েছে পানীয় জল নিয়ে। জমা জলের জেরে এলাকার অধিকাংশ পাতকুয়ো ডুবে যাওয়ায়, বিশুদ্ধ পানীয় জল সংগ্রহ করাও এখন প্রতি দিনের লড়াই। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দুর্ভোগ নতুন নয়। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে বর্ষা এলেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের। একাধিক বার জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও, স্থায়ী সমাধান আজও মেলেনি। ভোটের সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, ভোট শেষ হলেই সেই প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।
বর্তমানে এলাকার অধিকাংশ রাস্তা হাঁটুজলে ডুবে রয়েছে। ছোট ছোট পড়ুয়াদের স্কুলে যেতে চরম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কর্মজীবী মানুষদের প্রতি দিন জল ঠেলে কাজে যেতে হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ চলে গেলে বা আলো কম থাকলে, জলমগ্ন রাস্তায় চলাফেরা করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুল্যান্সও অনেক সময়ে এলাকায় ঢুকতে পারে না। ফলে, অসুস্থ বা বয়স্ক মানুষদের নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় থাকতে হয় পরিবারের সদস্যদের। জমা জলের কারণে এলাকার অধিকাংশ পাতকুয়ো জলের তলায় চলে গিয়েছে। সরকারি কল থাকলেও, সেখানে নিয়মিত পানীয় জল মিলছে না বলে অভিযোগ। ফলে, বাধ্য হয়ে লিলুয়া স্টেশন রোড এলাকা থেকে টাকা দিয়ে পানীয় জল কিনে আনতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আর্থিক চাপ বাড়ছে, অন্য দিকে প্রতি দিন জল সংগ্রহ করাও এক কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রিয়া সিং বলেন, ‘আমরা ছ’মাস ধরে জলবন্দি। বাড়ি থেকে বেরোতে গেলেই জল পেরোতে হয়। বহু বার অভিযোগ জানিয়েছি, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি।’ অন্য এক বাসিন্দা পূর্ণিমা মণ্ডল বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা পানীয় জল। টাকা দিয়ে জল কিনতে হচ্ছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে।’ চম্পা মণ্ডল বলেন, ‘বাজারে যাওয়া থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আনা, সবই খুব কঠিন হয়ে গিয়েছে। কেউ অসুস্থ হলে আরও বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। আমরা চাই, দ্রুত এই অবস্থার স্থায়ী সমাধান হোক।’ বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকার ফলে মশার উপদ্রবও বেড়েছে। ডেঙ্গি ও অন্যান্য জলবাহিত রোগের আশঙ্কায় আতঙ্কিত তাঁরা। শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের একটাই আবেদন, দ্রুত জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি করে এলাকাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হোক।
অন্য দিকে, বালি বিধানসভার বিধায়ক সঞ্জয় সিং জানিয়েছেন, জমা জলের সমস্যা দূর করতে প্রশাসন, পুরসভা, সেচ দপ্তর এবং কেএমডিএ-র আধিকারিকরা একযোগে কাজ করছেন। বিভিন্ন জায়গায় নিকাশি নালার স্ল্যাব খুলে জল নামানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও এই কাজে সহযোগিতা করছেন বলে তিনি জানান।
একাধিক এলাকার খারাপ রাস্তার প্রসঙ্গে সঞ্জয় সিং বলেন, ‘বর্ষাকালে স্থায়ী রাস্তার কাজ করা সম্ভব নয়। তবে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব ইতিমধ্যেই পাঠানো হয়েছে। বিধায়ক তহবিল থেকেও প্রায় এক কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজের পরিকল্পনা করা হয়েছে।’ বর্ষা শেষ হলেই রাস্তা সংস্কার ও জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তবে আশ্বাসে আর ভরসা রাখতে রাজি নন অনেক বাসিন্দাই। তাঁদের কথায়, বছরের পর বছর ধরে একই প্রতিশ্রুতি শুনে আসছেন তাঁরা। এ বার আর আশ্বাস নয়, দ্রুত স্থায়ী সমাধানই চান ভট্টনগর আমতলার মানুষ, যাতে জলবন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেন তাঁরা।